গরমের দাপটে বাড়ছে ৭ রোগ, সুস্থ থাকতে যা করবেন
প্রচণ্ড গরমে হাঁসফাঁস করছে জনজীবন। তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিও। অতিরিক্ত ঘামের কারণে শরীর থেকে পানি ও প্রয়োজনীয় লবণ বেরিয়ে যেতে পারে। এতে পানিশূন্যতার পাশাপাশি শরীরে সোডিয়াম ও পটাশিয়ামের ভারসাম্যও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই গরমের সময়ে অসুস্থতা এড়াতে প্রয়োজন বাড়তি সতর্কতা।
হিট স্ট্রোক
তীব্র গরমে সবচেয়ে বিপজ্জনক স্বাস্থ্যঝুঁকিগুলোর একটি হিট স্ট্রোক। দীর্ঘক্ষণ উচ্চ তাপমাত্রায় থাকলে শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ব্যাহত হয়ে এটি হতে পারে। মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা, অতিরিক্ত দুর্বলতা, বমি বমি ভাবসহ বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দিতে পারে। গুরুতর অবস্থায় আক্রান্ত ব্যক্তি অচেতনও হয়ে যেতে পারেন। তাই প্রচণ্ড রোদ এড়িয়ে চলা এবং পর্যাপ্ত তরল পান করা জরুরি।
খাদ্যে বিষক্রিয়া
গরম ও আর্দ্র পরিবেশে বিভিন্ন ধরনের জীবাণু দ্রুত বংশবিস্তার করতে পারে। এ কারণে গরমের সময়ে অপরিষ্কার পানি বা দূষিত খাবার খেলে খাদ্যে বিষক্রিয়ার ঝুঁকি বাড়ে। পেটব্যথা, বমি, বমি বমি ভাব ও ডায়রিয়া এ সমস্যার সাধারণ লক্ষণ। খোলা অবস্থায় রাখা খাবার, অপরিষ্কার পানি এবং ঠিকভাবে সংরক্ষণ না করা কাঁচা মাংস এড়িয়ে চলা উচিত।
পানিশূন্যতা
অতিরিক্ত গরমে শরীর থেকে ঘামের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ পানি ও লবণ বেরিয়ে যায়। ফলে দেখা দিতে পারে পানিশূন্যতা। এ সময় নিয়মিত পানি পান করা প্রয়োজন। শরীরে পানিশূন্যতার মাত্রা বেশি হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওআরএস গ্রহণ করা যেতে পারে। ডাবের পানি ও অন্যান্য তরলও পানির ঘাটতি পূরণে সহায়ক হতে পারে।
মাম্পস
মাম্পস একটি ভাইরাসজনিত সংক্রামক রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশি বা শ্বাসতন্ত্রের নিঃসরণের মাধ্যমে এটি অন্যদের মধ্যে ছড়াতে পারে। এ রোগে সাধারণত কানের নিচে বা সামনের প্যারোটিড গ্রন্থি ফুলে যায়। এর সঙ্গে জ্বর, গলা ও মুখের আশপাশে ব্যথা এবং অস্বস্তি দেখা দিতে পারে।
চিকেন পক্স
গরমের সময়ে চিকেন পক্সের সংক্রমণও দেখা দিতে পারে। এ রোগে শরীরে ছোট ছোট ফুসকুড়ি বা পানিভরা ফোসকা তৈরি হয় এবং আক্রান্ত স্থানে চুলকানি হতে পারে। পাশাপাশি জ্বর, মাথাব্যথা, ক্ষুধামন্দা ও শরীর খারাপ লাগার মতো উপসর্গ দেখা যায়।
হাম
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা মূলত শ্বাসতন্ত্রকে আক্রান্ত করে। জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, গলা ব্যথা ও চোখ লাল হয়ে যাওয়া এর সাধারণ লক্ষণ। অনেকের শরীরে পরবর্তী সময়ে লালচে ফুসকুড়িও দেখা দিতে পারে। সংক্রমণ প্রতিরোধে টিকাদান গুরুত্বপূর্ণ।
টাইফয়েড
দূষিত পানি ও খাবারের মাধ্যমে টাইফয়েড ছড়াতে পারে। অপরিষ্কার পরিবেশ ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এ রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। দীর্ঘস্থায়ী জ্বর, মাথাব্যথা, দুর্বলতা, ক্লান্তি, পেটে ব্যথা এবং ক্ষুধা কমে যাওয়া এর সাধারণ উপসর্গ। নিরাপদ পানি পান ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার মাধ্যমে সংক্রমণের ঝুঁকি কমানো যায়।
গরমে সুস্থ থাকতে করণীয়
প্রচণ্ড গরমে বাইরে বের হলে ঢিলেঢালা ও হালকা রঙের সুতির পোশাক পরা ভালো। রোদ থেকে বাঁচতে ছাতা বা টুপি ব্যবহার করা যেতে পারে। শিশু ও বয়স্কদের পাশাপাশি গর্ভবতী নারী এবং শারীরিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
শরীরে পানির ঘাটতি তৈরি হতে না দিতে নিয়মিত পানি পান করতে হবে। বাইরে থাকলে অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম এড়িয়ে চলা এবং সম্ভব হলে ছায়াযুক্ত স্থানে বিশ্রাম নেওয়া উচিত। খাবার তৈরির আগে, খাবার ধরার সময় এবং খাওয়ার আগে ভালোভাবে হাত পরিষ্কার করতে হবে।
গরমে খাবার দ্রুত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকায় দীর্ঘক্ষণ বাইরে রাখা খাবার এবং রাস্তার খোলা খাবার না খাওয়াই নিরাপদ। পাশাপাশি তরমুজ, শসা, আখ, আমসহ পানি ও পুষ্টিসমৃদ্ধ তাজা খাবার খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে।
অতিরিক্ত চা-কফি ও চিনিযুক্ত পানীয়ের পরিবর্তে পর্যাপ্ত পানি পান করা ভালো। চোখের সংক্রমণ থেকে বাঁচতে অপরিষ্কার হাতে চোখে হাত দেওয়া এড়িয়ে চলতে হবে। বাইরে বের হলে রোদ থেকে চোখ ও ত্বক সুরক্ষায় সানগ্লাস, টুপি ও উপযুক্ত সানস্ক্রিন ব্যবহার করা যেতে পারে।
হাম, মাম্পস ও রুবেলা প্রতিরোধে টিকাদান গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের নির্ধারিত টিকা দেওয়া হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। টিকা নিয়ে কোনো ঘাটতি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সবশেষে, গরমের সময় শরীরকে সুস্থ রাখতে পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও ঘুমের প্রয়োজন। ঘুমানোর জায়গা যতটা সম্ভব ঠান্ডা ও আরামদায়ক রাখা এবং নিয়মিত ঘুমের অভ্যাস বজায় রাখা শরীরের ওপর গরমের চাপ কমাতে সহায়তা করতে পারে।
Comments