৭০লাখ টাকার কর অব্যাহতি: ৫ লাখ নারী উদ্যোক্তার অধিকার ও বাস্তবতা
বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির নীরব বিপ্লব ঘটাচ্ছেন নারী উদ্যোক্তারা। তাদের এই অসামান্য অবদানকে স্বীকৃতি দিতে সরকার বার্ষিক *৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রয়ের (টার্নওভার) ওপর আয়কর অব্যাহতির* এক অভাবনীয় সুযোগ ঘোষণা করেছে। এটি কেবল একটি আর্থিক ছাড় নয়, বরং ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তাদের স্বাবলম্বী করার পথে রাষ্ট্রের দেওয়া সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক হাতিয়ার। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠ হলো—আইনি জটিলতা, তথ্যের অভাব এবং ডিবিআইডি (DBID) সংক্রান্ত ধীরগতির কারণে এই বিশাল সুবিধাটি এখনো অধিকাংশ উদ্যোক্তার নাগালে পৌঁছায়নি। কাগজে-কলমে নীতি থাকলেও, তথ্য ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির অভাবে প্রান্তিক নারী উদ্যোক্তারা কেন পিছিয়ে পড়ছেন এবং এই সুবিধা পাওয়ার সঠিক পথ কী, তা নিয়ে গভীর পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে।
সচেতনতার অভাবে হাতছাড়া হচ্ছে রাষ্ট্রীয় সুবিধা
সম্প্রতি ৫ এপ্রিল এক প্রাক-বাজেট আলোচনা সভায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) চেয়ারম্যান মো: আবদুর রহমান খান নারী উদ্যোক্তাদের এই কর সুবিধার বিষয়টি পুনরায় স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তিনি আক্ষেপ করে জানান যে, তথ্য ও সচেতনতার অভাবে কয়েক লাখ নারী উদ্যোক্তা তাদের প্রাপ্য ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত কর অব্যাহতি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এনবিআর চেয়ারম্যানের এই পর্যবেক্ষণ এবং সেন্টার ফর ডিজিটাল কমার্স Research and Advocacy (CDCRA)-এর সাম্প্রতিক গবেষণালব্ধ তথ্য একটি গভীর সংকটের দিকে নির্দেশ করে। আমাদের গবেষণা অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ৫ লাখ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় রয়েছেন, যাদের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশই নারী। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, এই বিশাল জনশক্তির মধ্যে মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ উদ্যোক্তা ট্রেড লাইসেন্স বা ই-টিন (e-TIN) এর আওতায় রয়েছেন। ফলে প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ উদ্যোক্তাই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে থাকায় সরকারি কর সুবিধা বা ব্যাংক ঋণের অধিকার হারাচ্ছেন।
ডিবিআইডি ও ট্রেড লাইসেন্স: উদ্যোক্তাদের 'ডিজিটাল পাসপোর্ট' সংকট
অনলাইনে ব্যবসার স্বচ্ছতা নিশ্চিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রবর্তিত ডিজিটাল বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন বা ডিবিআইডি (DBID) বর্তমানে একটি রাষ্ট্রীয় নির্দেশনা হলেও মাঠ পর্যায়ে এর প্রয়োগ বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। একে ব্যবসার 'ডিজিটাল পাসপোর্ট' হিসেবে গণ্য করা হলেও, ৫ লাখ উদ্যোক্তার বিপরীতে এ পর্যন্ত মাত্র ১৫ থেকে ২০ হাজার আইডি ইস্যু হয়েছে। এর মূল কারণ হলো বাণিজ্যিক ট্রেড লাইসেন্স এবং ভাড়ার চুক্তিনামার কঠোর শর্ত। অনেক নারী উদ্যোক্তা পারিবারিক আবহে ব্যবসা পরিচালনা করায় এই শর্তগুলো পূরণ করতে পারছেন না। বাস্তবতার এই চিত্রটি ফুটে ওঠে ঢাকার মিরপুরের নিপা ইসলামের (ছদ্মনাম) গল্পে। গত তিন বছর ধরে সফলভাবে পোশাক বিক্রি করে বার্ষিক ৫০ লাখ টাকা টার্নওভার করলেও কোনো প্রাতিষ্ঠানিক নথিপত্র না থাকায় তিনি ব্যাংক লোনের সুযোগ হারান এবং কর অব্যাহতির অধিকার থেকেও বঞ্চিত হন। নিপার মতো এমন লাখো উদ্যোক্তা আজ তথ্যের অভাবে সরকারি সব সুযোগ-সুবিধা থেকে যোজন যোজন দূরে দাঁড়িয়ে আছেন।
আইনি রক্ষাকবচ: ৭০ লাখ টাকার কর ছাড় ও ঋণের হাতছানি
অর্থ আইন ২০২১ অনুযায়ী, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত টার্নওভারে আয়কর শূন্য করা হয়েছে। এছাড়া SRO ১৬২-এর অধীনে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সুরক্ষায় উৎপাদন ও সেবা পর্যায়ে ভ্যাট অব্যাহতি এবং ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত সাধারণ টার্নওভার কর অব্যাহতির বিধান রয়েছে। তবে এই সুবিধা ভোগ করতে হলে প্রতি বছর 'জিরো রিটার্ন' দাখিল করা বাধ্যতামূলক, যা অনেক উদ্যোক্তাই জানেন না। কর ছাড়ের পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের SMESPD সার্কুলার অনুযায়ী নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানতবিহীন (Collateral Free) ঋণের নির্দেশনাও রয়েছে। এমনকি হস্তশিল্প বা কৃষিজাত পণ্য রপ্তানিতে ৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত নগদ সহায়তা এবং এসএমই সার্টিফিকেট থাকলে সাশ্রয়ী মূল্যে ইউটিলিটি সুবিধা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
সমাধানের পথ: ওয়ান স্টপ সার্ভিস ও নথির সমন্বয়
একজন নারী উদ্যোক্তাকে সরকারি এই বিশাল বলয়ের আওতায় আসতে হলে মূলত পাঁচটি ধাপ সম্পন্ন করতে হবে। ব্যক্তিগত ই-টিন সংগ্রহ, ট্রেড লাইসেন্স নিশ্চিত করা, ডিবিআইডি গ্রহণ এবং এসএমই সার্টিফিকেট অর্জন করা এই প্রক্রিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তথ্যগত সামঞ্জস্যতা; অর্থাৎ ই-টিন, ট্রেড লাইসেন্স এবং ডিবিআইডি—সবগুলোতে নাম ও তথ্যের হুবহু মিল থাকতে হবে। বর্তমানে নারী উদ্যোক্তাদের ৫টি ভিন্ন দপ্তরে না পাঠিয়ে সেবাকে হাতের নাগালে আনতে সরকারের কাছে আমাদের সুনির্দিষ্ট দাবি হলো একটি 'সমন্বিত ওয়ান স্টপ সার্ভিস' বা কেন্দ্রীয় অনলাইন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা। যেখান থেকে একটি মাত্র আবেদনের মাধ্যমে সব নথিপত্র পাওয়া সম্ভব হবে। সেই সঙ্গে উদ্যোক্তাদের জন্য বাসার ঠিকানাকেই বাণিজ্যিক ঠিকানা হিসেবে ডিবিআইডি ও ট্রেড লাইসেন্সের অনুমোদন দেওয়া এখন সময়ের দাবি।
নারীর অর্থনৈতিক মুক্তি কেবল একটি পরিবারের স্বচ্ছলতা নয়, এটি আগামীর 'স্মার্ট বাংলাদেশ' বিনির্মাণের মূল ভিত্তি। ৭০ লাখ টাকার কর সুবিধা তখনই সার্থক হবে যখন একজন নারী উদ্যোক্তাকে নথিপত্রের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হবে না। সরকার যদি সত্যিই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বড় করতে চায়, তবে সেবাকে সহজলভ্য ও ওয়ান স্টপ সার্ভিসের আওতায় আনতে হবে। উদ্যোক্তারা যখন জানবেন যে নিবন্ধিত হওয়া মানে হয়রানি নয় বরং রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সুরক্ষা, তখনই তারা জাতীয় অর্থনীতিতে পূর্ণ শক্তিতে অবদান রাখবেন।
Comments