পাশাপাশি ৫ কবরে চিরনিদ্রায় মা, তিন মেয়ে ও ভাই, গাজীপুরে শোক
ঘড়ির কাটায় ভোর তখন ৬টা আশপাশে, সকল আইনি প্রক্রিয়া শেষে দুই লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সে করে ৫ নিথর লাশ পৌঁছায় গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার পাইককান্দি ইউনিয়নের উত্তরপাড়া গ্রামের ফকিরবাড়ীতে। একে একে পাঁচটি নিথর দেহ নামানো হয় অ্যাম্বুলেন্স থেকে। আর তখনই পরিবার ও স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ।
গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজের মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে গতকাল রাতে লাশগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে গাজীপুর জেলা প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় লাশগুলো গোপালগঞ্জে পাঠানো হয়।
রবিবার সকালে সদর উপজেলার ফকিরবাড়ী গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের পাশে উত্তর চরপাড়া গ্রামের বাড়ির পাশে ছোট সড়কে লাশবাহী দুটি অ্যাম্বুলেন্স রাখা। ৬ মাস আগেও যে বাড়ির উঠান আর পাশের বাগানে খেলাধুলা করে বেড়াতো তিন শিশু, সেই বাগানেই মা আর মামার সাথে করানো হয় গোসল। পাশের মেহগনিবাগানে আলাদা দুটি মশারি টানিয়ে নারী ও পুরুষের লাশ গোসল করানো হচ্ছে। নিহতদের শেষ বারের মতো দেখতে ফকিরবাড়ীতে ভিড় করে আত্মীয়-স্বজন ও গ্রামবাসী। এক সাথে একই পরিবারের ৫ জনের লোমহর্ষক মৃত্যুর এমন ঘটনা এর আগে দেখেনি তারা| তাই কেউই চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। অনেকে চিৎকার করে আত্মনাদ করেছেন। হৃদয়স্পর্শি এমন ঘটনায় গ্রামজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
গোসল শেষে বেলা ১১টার দিকে পাইককান্দি পঞ্চপল্লী মাদ্রাসা মাঠে নিহতদের জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। এরপর বেলা সাড়ে ১১টার দিকে উত্তর চরপাড়া কবর স্থানে একসাথে সারিবদ্ধভাবে ৫টি কবরে তাদের দাফন করা হয়।
এ ঘটনায় শারমিনের স্বাামী ফোরকান মিয়ার নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা তিন থেকে চারজনকে আসামি করে কাপাসিয়া থানায় হত্যা মামলা করেন শাহাদাত হোসেন। ফোরকান গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার মেরী গোপীনাথপুর গ্রামের বাসিন্দা। ঘটনার পর থেকে তিনি পলাতক। ঘটনার পরপরই জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুজনকে আটক করেছে পুলিশ। তবে তাঁদের পরিচয় জানা যায়নি।
নিহতদের স্বজন ও স্থানীয়রা বলেছেন, এ ঘটনা নিহত শারমিনের স্বামী ফোরকান একা ঘটাতে পারে না। এর সাথে অন্যরা জড়িত থাকতে পারে। তাই এই ঘটনার জড়িত সকল আসামিদের গ্রেফতার করে ফাঁসি দিতে হবে।
বাড়িতে আহাজারি করছিলেন শারমিনের মা ফিরোজা বেগম ও বোন ফাতেমা বেগম। বড় বোন ফাতেমা বেগম বলেন, তিনি গাজীপুরে থাকেন। শারমিন ১০ থেকে ১৫ দিন পরপর তার বাসায় যেতেন। তখন শারমিন প্রায়ই স্বামীর আচরণ নিয়ে কষ্টের কথা বলতেন। ফোরকান অত্যন্ত সন্দেহপ্রবণ ছিলেন। শারমিনের হাতে মুঠোফোন পর্যন্ত রাখতে দিতেন না। সংসারে অশান্তি থাকলেও সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে শারমিন সবকিছু সহ্য করতেন।
নিহত শারমিন আক্তার ও রসুলের মা ফিরোজা বেগম এ ঘটনার পর থেকে অনেকটা বাকরুদ্ধ। দুই সন্তান ও তিন নাতনিদের শোকে কাতর তিনি। তিনি এ হত্যাকান্ডের সাথে জড়িতদের গ্রেফতার করে ফাঁসি দাবি জানিয়েছেন।
নিহত শারমিন ও রসুলের পিতা শাহাদাৎ মোল্লা বলেছেন, এক বছর ধরে ফোরকান আমাকে মেয়েকে নানা নির্যাতন ও যৌতুকের জন্য চাপ সৃষ্টি করছিল। এ কারণে আমার মেয়ে বাড়িতে চলে এসেছিল। আমরা সন্দেহ করছি ওর (ফোরকান) পরকীয়া সম্পর্ক ছিল। ও (ফোরকান) নেশা করতো। ও (ফোরকান) আমার ছেলে, মেয়ে ও নাতনিদের ঘুমের ওষুধ খাইয়ে গলা কেটে হত্যা করেছে। আমি ওর (ফোরকান) সহ এ ঘটনার সাথে জড়িত সবার ফাঁসি চাই।
গোপালগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম এন্ড অপস) মোহাম্মদ জিয়াউল হক জানিয়েছেন, ঘটনাটি গাজীপুরের হলেও এটি একটি বড় ঘটনা। তাই আসামিকে ধরতে পুলিশ কাজ করছে। আশাকরি, দ্রুততম সময়ে ঘাতক ফোরকান মোল্লাসহ এ ঘটনার সাথে জড়িত অন্য কেউ থাকলে তাদেরকে গ্রেফতার করা সম্ভব হবে।
প্রসঙ্গত, শনিবার ভোরে গাজীপুরের কাপাসিয়ায় রাউৎকোনা গ্রামের ফোরকান মোল্লার বাড়িতে এক পরিবারের পাঁচজনকে গলা কেটে হত্যার ঘটনা প্রকাশ্যে আসে। তারা হলেন, গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার পাইককান্দি ইউনিয়নের পাইকান্দি উত্তর চরপাড়া গ্রামের শাহাদাৎ মোল্লার মেয়ে শারমিন আক্তার (৩৫), ছেলে রসুল মোল্লা (১৯), শারমিনের তিন মেয়ে মীম আক্তার ( ১৪), হাবিবা (১০), ফারিয়া (২)।
Comments