চসিকের রাজস্ব বিভাগে দুর্নীতির জাল, অভিযোগের মুখে দুই শীর্ষ কর্তা
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) রাজস্ব বিভাগে প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা ভেঙে চরম অনিয়ম, সুসংগঠিত চাঁদাবাজি এবং ক্ষমতার পদ্ধতিগত অপব্যবহারের এক বিস্ফোরক অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা সরওয়ার কামাল এবং রাজস্ব কর্মকর্তা সাব্বির রহমান সানিকে এসব অনিয়মের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ভুক্তভোগী আসিফ মাহমুদ এই দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একটি সুসংগঠিত আর্থিক উৎকোচ আদায়ের 'প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো' গড়ে তোলার অভিযোগ এনেছেন।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, অভিযুক্ত দুই কর্মকর্তা কৌশলগত ও প্রভাববলয়নির্ভর পদ্ধতিতে ট্যাক্স অফিসার (TO), ডেপুটি ট্যাক্স অফিসার (DTO), কর আদায়কারী এবং অনুমোদন পরিদর্শকদের নিকট হতে নিয়মিত অর্থ আদায় করে আসছেন। এর ফলে বহু নিম্নস্তরের কর্মচারী মাসিক পারিশ্রমিক গ্রহণ করলেও বিভিন্ন অজুহাতে সেই অর্থের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কর্তন করা হচ্ছে। এমনকি টিও মজিদ, রাশেদ এবং দবির নামীয় তিন কর্মকর্তার নিকট হতে 'স্কেল অনুমোদন' প্রদানের নামে আনুমানিক ৬০ লাখ টাকা আদায় করা হয়েছে এবং স্থায়ী পদে বহাল না থাকা সত্ত্বেও তাদের পদোন্নতি প্রদান করা হয়েছে, যা প্রশাসনিক নীতিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
অভিযোগের একটি চাঞ্চল্যকর দিক হলো তথাকথিত 'মিটিং বাণিজ্য'। প্রতি মাসে গড়ে ২২টি সভার আয়োজন করে আপ্যায়নের অজুহাতে ২০ হাজার টাকা করে আদায় করা হয়, যা প্রকৃতপক্ষে একটি সুসংগঠিত অর্থ লেনদেনের প্রবাহ মাত্র। এর পাশাপাশি রাজস্ব বিভাগে বিভিন্ন ব্যক্তির নামে পার্সেল গ্রহণ করে অতিরিক্ত বিল প্রদর্শনের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের একটি সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়াও কার্যকর রয়েছে, যা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সহকারীর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া 'পিকনিক' আয়োজনের আড়ালে নিয়মিত চাঁদা আদায় এবং তাতে অনীহা প্রকাশ করলে কর্মচারীদের নানামুখী প্রশাসনিক হয়রানি ও চাপের শিকার হতে হয়।
দুর্নীতির এই জাল আরও বিস্তৃত হয়েছে 'সার্কেল ভিজিট' কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে, যেখানে প্রতিবার ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থ আদায় করা হয়। পাশাপাশি বৃহৎ অঙ্কের হোল্ডিং চেক নির্দিষ্ট কিছু ব্যাংকে জমা প্রদান করে সেখান থেকে ব্যক্তিগত সুবিধা আহরণ এবং বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে কম্পিউটার ও এলইডি টেলিভিশনের মতো উপঢৌকন গ্রহণের বিষয়টিও অভিযোগে উঠে এসেছে। এছাড়া রাজস্ব বিভাগের বিভিন্ন সার্কেলে ভীতি সঞ্চার ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে তথাকথিত দালাল নিয়োগের অভিযোগ আনা হয়েছে, যারা কর্মচারীদের ওপর প্রভাব বিস্তার করে অর্থ আদায়ে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে জানতে চাইলে আসিফ মাহমুদ বলেন, তিনি আপাতত কোনো মন্তব্য করতে চান না এবং দুদক ও চসিকের তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষায় আছেন। তদন্ত শেষে তিনি সকল তথ্য-প্রমাণ গণমাধ্যমের কাছে প্রকাশ করবেন বলে জানান। তবে তিনি মেয়রের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বাইরে রেখে একটি উন্মুক্ত গণশুনানির আয়োজন করা হলে প্রকৃত পরিস্থিতি উন্মোচিত হবে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে রাজস্ব কর্মকর্তা মো. সাব্বির রাহ্মান সানির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, 'কে, কখন, কোথায় অভিযোগ করেছে, আমি জানি না। অভিযোগে উত্থাপিত বিষয়গুলোর সঙ্গে আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই'।
একই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চসিকের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা (উপসচিব) এস. এম. সরওয়ার কামাল বলেন, 'অভিযোগ সংক্রান্ত বিষয়ে আমি কোনো ধরনের বক্তব্য দেব না। অভিযোগ ছাড়া অন্য কোনো প্রয়োজন থাকলে অফিসে আসুন'।
Comments