ইতালির স্পন্সর ভিসা জটিলতা: সমাধানে দূতাবাস ও IOM-এর যৌথ উদ্যোগ
স্পন্সর (নন-সিজনাল) কর্মী ভিসায় বাংলাদেশ থেকে ইতালিতে এসে যারা বর্তমানে 'স্টে পারমিট' (permesso di soggiorno) নবায়ন সংক্রান্ত জটিলতায় চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন, তাদের জন্য একটি ইতিবাচক সমাধানের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি ইতালির রোমে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের বিশেষ তত্ত্বাবধানে 'ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশন' (IOM)-এর প্রতিনিধিবর্গের সাথে ভুক্তভোগী বাংলাদেশি কর্মীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। IOM-এর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে কর্মীদের সমস্যা নিয়ে বিশদ আলোচনা হয় এবং তা সমাধানে আন্তর্জাতিক এই সংস্থাটি সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছে।
বৈঠকে অংশ নেওয়া কর্মীরা জানান, তারা মূলত বাংলাদেশ থেকে সম্পূর্ণ বৈধ 'নন-সিজনাল' স্পন্সর ভিসা নিয়ে ইতালিতে পাড়ি জমিয়েছিলেন। কিন্তু ইউরোপের এই দেশটিতে পৌঁছানোর পর তারা আইনি ও নিয়মতান্ত্রিক কিছু মারপ্যাঁচে পড়ে চরম সংকটে পড়েছেন। মাঠ পর্যায় থেকে উঠে আসা প্রধান সমস্যাগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
নিয়োগকর্তার প্রতারণা ও গাফিলতি: অনেক কর্মী ইতালিতে এসে দেখেন, যে নিয়োগকর্তা বা কোম্পানি তাদের স্পন্সর করেছিল, বাস্তবে তার কোনো অস্তিত্ব নেই (কাগুজে কোম্পানি), কোম্পানি দেউলিয়া হয়ে গেছে অথবা নিয়োগকর্তা তাদের কাজে নিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে।
কাজের চুক্তি (Contratto di Lavoro) না হওয়া: ইতালীয় আইন অনুযায়ী, দেশটিতে পৌঁছানোর পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিয়োগকর্তার সাথে মূল কাজের চুক্তি সই করে তা সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরে (Prefettura) জমা দিতে হয়। কিন্তু মূল নিয়োগকর্তাকে না পাওয়ায় এই কর্মীরা চুক্তিপত্র সম্পন্ন করতে পারেননি।
স্টে পারমিট নবায়নে ব্যর্থতা: কাজের বৈধ চুক্তিপত্র এবং নিয়মিত ট্যাক্স (Contributi) প্রদানের রসিদ না থাকায়, এই কর্মীরা যখন তাদের প্রথম স্টে পারমিট (যা প্রাথমিক রসিদ বা 'কুদুল্লা' আকারে থাকে) নবায়ন বা পূর্ণাঙ্গ কার্ডে রূপান্তর করতে যাচ্ছেন, তখন ইতালীয় ইমিগ্রেশন অফিস তা আটকে দিচ্ছে।
বৈধ কাগজপত্রের অভাবে এই কর্মীরা বর্তমানে কোনো ভালো কোম্পানিতে কাজ পাচ্ছেন না। অনেকে বাধ্য হয়ে অত্যন্ত কম মজুরিতে অনানুষ্ঠানিক খাতে (ব্ল্যাক মার্কেট) কাজ করছেন। একই সাথে ইতালির স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুবিধাদি থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি সবসময় দেশে ফেরত পাঠানোর (Deportation) আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন তারা।
একজন ভুক্তভোগী বাংলাদেশি কর্মী জানান "বৈধ ভিসা নিয়ে এসেও আমরা আজ এখানে অপরাধীর মতো লুকিয়ে বেড়াচ্ছি। না পাচ্ছি কাজ, না পারছি বৈধ কার্ড করতে। IOM ও দূতাবাসের এই উদ্যোগ আমাদের মনে নতুন করে বাঁচার আশা জাগিয়েছে।"
IOM কার্যালয়ের এই বৈঠকে ভুক্তভোগী কর্মীদের আবাসন, আইনি জটিলতা এবং স্টে পারমিট নবায়নের ক্ষেত্রে সৃষ্ট প্রতিবন্ধকতাগুলোর প্রতিটি দিক নিয়ে খোলেমেলা আলোচনা করা হয়। বাংলাদেশ দূতাবাসের মধ্যস্থতায় প্রবাসীদের এই দুর্দশার চিত্র আন্তর্জাতিক সংস্থাটির সামনে নিখুঁতভাবে তুলে ধরা হয়।
কর্মীদের বক্তব্য ও দুর্দশার বিবরণ অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে শোনার পর, এই সংকটের একটি স্থায়ী ও আইনি সমাধানকল্পে IOM-এর পক্ষ থেকে একটি সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের জোরালো আশ্বাস প্রদান করা হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা এই সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশ দূতাবাসের এই কার্যকরী মধ্যস্থতা এবং জাতিসংঘের আওতাধীন সংস্থা IOM-এর এগিয়ে আসা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন কূটনৈতিক ও প্রবাসী বিশেষজ্ঞরা।
সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এই সমন্বিত উদ্যোগ সফল হলে ভুক্তভোগী কর্মীরা বিকল্প নিয়োগকর্তা খোঁজার সুযোগ বা বিশেষ আইনি সুরক্ষাবলয় (Special Legal Protection) পেতে পারেন। এর ফলে বহু প্রতীক্ষিত স্টে পারমিট নবায়নের পথ সুগম হবে এবং শত শত প্রবাসী বাংলাদেশি কর্মী ইতালিতে বৈধভাবে বসবাস ও কাজ করার অধিকার ফিরে পাবেন।
বাংলাদেশ দূতাবাস ও IOM-এর এই যৌথ উদ্যোগের সফল বাস্তবায়নের দিকে এখন চাতক পাখির মতো চেয়ে আছেন ইতালিতে অবস্থানরত ভুক্তভোগী শত শত রেমিট্যান্স যোদ্ধা।
Comments