সরকারি স্কুলশিক্ষিকার অবৈধ ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য!
সরকারী চাকুরি করেন রংপুরে। কিন্তু ঢাকার উত্তরায় কিনেছেন রাজউকের ফ্ল্যাট। একটি বেসরকারি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হিসেবে আয় করছেন বিপুল অর্থ। স্বামীর সাথে মিলে এখন হজ-ওমরাহ ব্যবসার আড়ালে সৌদি আরবে স্বর্ণের ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছেন। তিনি শামীমা দিলরুবা রায়হান লিমি। রংপুর সদরের নুরপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা তিনি। ২৩ বছরের চাকুরী জীবনে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন তিনি। জমি কেনাবেচা, প্লট আকারে বিক্রি, এমএলএম ব্যবসার আড়ালে স্বামীর অবৈধ কাজে সহযোগিতায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা হয়েও তিনি ১২ কোটি টাকার বেশি সম্পদের মালিক।
শামীমা দিলরুবা রায়হান লিমি আয়কর টিন নম্বর অনুযায়ী ট্যাক্স সার্কেল ১৩ (টিন নম্বর: ২৭৯২৬৫৬৯৪১৬৩) খোঁজ নিয়ে আয়ের চেয়ে জ্ঞাত আয় বর্হিভূত অবৈধ সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে। একজন সরকারি চাকুরিজীবী হয়েও লিমি জমি কেনা-বেচা, হজ ওমরাহ ব্যবসায় সরাসরি জড়িত। কোন রাখঢাক না রেখেই ফেসবুকে পোস্ট করে ব্যবসার প্রচার করেন তিনি। সরকারি স্কুল শিক্ষক হয়েও প্রিন্সমার্ট লিমিটেডের মতো লাভজনক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়মিত ঢাকায় বোর্ড মিটিংয়ে অংশগ্রহণ করেন। রাজউক উত্তরা ফ্ল্যাট প্রকল্পে একটি ফ্ল্যাট কিনেছেন। রংপুরের আর কে রোডে বিলাসবহুল ফ্ল্যাটসহ পুরো ভবনের মালিকানা রয়েছে। অবৈধভাবে অর্থ উপার্জনকারী স্কুলশিক্ষিকা শামীমা দিলরুবা রায়হান লিমির অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধানে প্রাথমিকভাবে তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন- দুদক। একইসাথে সরকারী চাকুরি করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হিসেবে বোর্ড মিটিংয়ে অংশগ্রহণের বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে রংপুর জেলা প্রশাসন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শামীমা দিলরুবা রায়হান লিমির বাড়ি লালমনিরহাটের কালীগঞ্জে। তার স্বামী খোরশেদুর রহমান প্রিন্স দুই দশক আগে রংপুর বাসস্ট্যান্ডের পাশে আদর্শ ফ্যার্মেসীর দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। আর সহকারী শিক্ষক হিসেবে ক্যারিয়ার গড়েন লিমি। কিন্তু জমির ব্যবসা এবং ওমরাহ ও হজ ব্যবসায় নেমে রাতারাতি কোটিপতি বনে যান প্রিন্স-লিমি দম্পত্তি। সাবওয়ে ট্যুরস এন্ড ট্রাভেলস নামে এজেন্সির মালিক এই দম্পতি। বিমানবন্দরে ট্যাক্স ফাঁকি দিতে বৃহত্তর রংপুরের ওমরাহগামী যাত্রীদের দেশে ফেরার সময় গলা ও হাতে স্বর্ণালংকার পড়িয়ে দেশে নিয়ে আসেন। সরকারী আইন অনুযায়ী নির্দ্দিষ্ট পরিমাণ স্বর্ণ দেশে আনতে সরকারকে কোন ট্যাক্স দিতে হয় না। এই সুযোগ নিয়ে লিমি-প্রিন্স দম্পতি অবৈধ স্বর্ণের ব্যবসা করে কামিয়েছেন বিপুল অর্থ।
দিলরুবার স্বামী খোরশেদুর রহমান প্রিন্স মানুষের জমি জোরপূর্বক দখল, হাউজিংয়ের ব্যবসা, প্রিন্সমার্টের মতো এমএলএম কোম্পানি খুলে এই দম্পতি রাজধানী ঢাকা ও রংপুরে গড়ে তুলেছেন বিপুল অর্থের সাম্রাজ্য। মানুষের জমি জোরপূর্বক দখল করে প্রিন্স এবং শামীমা দিলরুবা রায়হান লিমি গড়ে তুলেছেন রংপুর মডার্ন প্রিন্স সিটি। একইসাথে রংপুর নিকেতন বিদ্যালয়ের পাশে হাজী গ্র্যান্ড প্রোপার্টিজের ভবন নির্মাণের কথা বলে এই দম্পতি মানুষের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে নির্মাণ কাজ শুরু না করে আত্মসাতের পায়তারা করছে। দর্শনার দেওডোবায় মডার্ন সিটিতে বিনিয়োগের কথা বলে মানুষের কাছ থেকে টাকা নিয়ে আত্মসাত করার অভিযোগ রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিনিয়োগকারী জানান, দুই বছর পূর্বে রংপুর জজকোর্টের পাশে হাজী গ্র্যান্ড প্রোপার্টিজ নামে আবাসন কোম্পানি খুলে লিমি-প্রিন্স দম্পতিকে ব্যাংক পে অর্ডারের মাধ্যমে ১ কোটি ৩৫ লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করা হয়। কিন্তু সেই অর্থ অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে ভবনের নির্মাণ কাজ অদ্যবধি শুরু করেনি লিমি-প্রিন্স দম্পতি। বিনিয়োগের অর্থ ফেরত চাইতে গেলে এই দম্পতি বিনিয়োগকারীর সাথে দুর্ব্যবহার করে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন।
লিমি-প্রিন্স দম্পতির প্রতারণার শিকার মো: হোসেন নামে ভুক্তভোগী এক ব্যবসায়ী জানান, রংপুরে ব্যবসায়িক বিনিয়োগ হিসেবে হাজী গ্র্যান্ড প্রপার্টিজের তত্ত্বাবধানে রংপুর সিটি করপোরেশনের মধ্যে জেলা জজ কোর্টের পাশে ২৭ ও ২৮ নম্বর প্লটে রংপুর সিটি হার্ট প্রকল্পে দুই বছর পূর্বে দ্বিগুণ লভ্যাংশসহ অর্থ বিনিয়োগ করা হলেও প্রকল্প এখন শুরু হয়নি। চেক প্রতারণার মামলায় ইতোমধ্যে খোরশেদুর রহমান প্রিন্সের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। জমির অবৈধ লেনদেনে খোরশেদুর রহমান প্রিন্স ও শামীমা দিলরুবা রায়হান লিমির বাল্যবন্ধু ১৮তম বিসিএস জুডিসিয়াল এক কর্মকর্তার সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। বিগত সরকারের সময় আইন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব পদে কর্মরত প্রভাবশালী সেই কর্মকর্তার প্রভাবে লিমি-প্রিন্স দম্পতি রংপুরে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন।
সরকারী চাকুরিজীবী হিসেবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হিসেবে বোর্ড মিটিংয়ে অংশগ্রহণের বিষটি অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত শামীমা দিলরুবা রায়হান লিমি। তিনি কোন ব্যবসার সাথে জড়িত নন বলে দাবি করেছেন। তবে অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে নুরপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষিকার বিরুদ্ধে তদন্ত চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছেন রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন। তিনি জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে তদন্ত করে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে।
Comments