নন-লাইফ বীমা খাতের ভাবনা : টেকসই প্রবৃদ্ধি ও ন্যায্য কর কাঠামো
বাংলাদেশের আর্থিক খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত অংশ হলো নন-লাইফ বীমা খাত। শিল্প, বাণিজ্য, আমদানি-রপ্তানি, অবকাঠামো এবং কৃষি-প্রতিটি ক্ষেত্রেই ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার জন্য এই খাত অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। তবুও কর ও ভ্যাট কাঠামোর বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে এই খাত তার পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছাতে পারছে না। আসন্ন জাতীয় বাজেট প্রণয়নের প্রেক্ষাপটে নন-লাইফ বীমা খাতের জন্য কিছু কাঠামোগত সংস্কার সময়োপযোগী ও জরুরি।
আমদানি পণ্যের ছাড়পত্রে বাধ্যতামূলক বীমা
আমদানি পণ্যের ছাড়পত্রে বাধ্যতামূলক বীমা নীতিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ বীমা পলিসির পরিবর্তে কভার নোটের মাধ্যমে পণ্য ছাড় করা হয়, যা প্রায়ই কম মূল্যে দেখানো হয়। এর ফলে সরকার রাজস্ব হারায় এবং বীমা খাতও সম্ভাব্য প্রিমিয়াম আয় থেকে বঞ্চিত হয়। সঠিক বীমা পলিসি জমা বাধ্যতামূলক করা এবং তদারকি জোরদার করলে রাজস্ব বৃদ্ধি পাবে এবং বাজারে স্বচ্ছতা আসবে।
পুনর্বীমায় কর ও ভ্যাট
পুনর্বীমা লেনদেনে কর ও ভ্যাট আরোপের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। পুনর্বীমা মূলত ঝুঁকি বণ্টনের একটি প্রক্রিয়া, যেখানে কোনো নতুন মূল্য সংযোজন হয় না। একটি বীমা প্রিমিয়ামের ওপর একবার কর ও ভ্যাট আরোপের পর পুনর্বীমা প্রিমিয়ামের ওপর আবার কর ও ভ্যাট আরোপ করা হলে তা কার্যত দ্বৈত করের শামিল হয়। এর ফলে বীমা কোম্পানিগুলোর পরিচালন ব্যয় বেড়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত গ্রাহকদের ওপর প্রিমিয়াম বৃদ্ধি হিসেবে এর প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে মেরিন, বিদ্যুৎ খাত, এভিয়েশন এবং অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ খাতে এই চাপ আরও বেশি দৃশ্যমান হয়। তাই এসব ক্ষেত্রে পুনর্বীমা প্রিমিয়ামের ওপর কর ও ভ্যাট অব্যাহতি প্রদান করলে খাতটি আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে।
বীমা খাতে পুনর্বীমা লেনদেনের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ১০ শতাংশ করের বহুমাত্রিক প্রয়োগ একটি 'ক্যাসকেডিং ইফেক্ট' তৈরি করছে। বর্তমানে বীমা কোম্পানিগুলো প্রিমিয়ামের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং নিট মুনাফার ওপর ৩৭.৫ শতাংশ হারে কর প্রদান করে থাকে। এর ওপর পুনর্বীমা প্রিমিয়ামে আবার ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ১০ শতাংশ কর আরোপ করলে ঝুঁকি স্থানান্তরের খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। এর ফলে কোম্পানিগুলো পর্যাপ্ত পুনর্বীমা গ্রহণে নিরুৎসাহিত হতে পারে, যা সামগ্রিকভাবে খাতের স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তাই ফাইন্যান্স আইনে সংশোধনের মাধ্যমে পুনর্বীমা লেনদেনে ভ্যাট ও কর থেকে অব্যাহতি প্রদান করা প্রয়োজন।
ব্যবস্থাপনা ব্যয়কে করযোগ্য না রাখা
ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের সীমা অতিক্রম করলে সেটিকে আয় হিসেবে গণ্য করে উচ্চ হারে কর আরোপের বর্তমান বিধান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ব্যবসা সম্প্রসারণ, প্রযুক্তি উন্নয়ন, মানবসম্পদ বিকাশ-এসব ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত ব্যয় হওয়া স্বাভাবিক। এই ব্যয়কে আয় হিসেবে বিবেচনা করা হলে তা একটি কৃত্রিম কর-চাপ সৃষ্টি করে,যা কোম্পানিগুলোর উন্নয়নমূলক বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করে। তাই অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয়কে পূর্ণাঙ্গভাবে করযোগ্য আয় থেকে বাদ দিয়ে বৈধ ব্যবসায়িক ব্যয় হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত।
নন-লাইফ বীমা কোম্পানি আর ব্যাংক এক নয়
নন-লাইফ বীমা কোম্পানিগুলোর করহার বর্তমানে ৩৭.৫% শতাংশ যা ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সমান। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বীমা খাতের মুনাফার মার্জিন তুলনামূলকভাবে কম এবং দাবি পরিশোধের দায় অনেক বেশি। অন্যদিকে উৎপাদন ও সেবা খাতে করহার প্রায় ২৫ শতাংশ হওয়ায় একটি বৈষম্যমূলক পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বীমা খাতের করহার কমিয়ে অন্যান্য সেবা খাতের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পর্যায়ে আনা হলে বিনিয়োগ বাড়বে, খাতের প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে এবং বীমা সেবার বিস্তৃতি ঘটবে।
নন-লাইফ স্বাস্থ্য বীমায় ভ্যাট বৈষম্যমূলক
নন-লাইফ খাতে স্বাস্থ্য বীমার ওপর ভ্যাট আরোপ সাধারণ মানুষের জন্য এই সেবা গ্রহণকে ব্যয়বহুল করে তুলছে। যেখানে জীবন বীমা ভ্যাটমুক্ত, সেখানে নন-লাইফ স্বাস্থ্য বীমার ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ একটি স্পষ্ট বৈষম্য তৈরি করেছে। এর ফলে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষ স্বাস্থ্য বীমা গ্রহণে নিরুৎসাহিত হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ায়। তাই স্বাস্থ্য বীমা প্রিমিয়ামকে ভ্যাটমুক্ত করা হলে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা জোরদার হবে এবং স্বাস্থ্য ব্যয়ের আর্থিক ঝুঁকি কমবে।
কৃষকের সুরক্ষায় কৃষি বীমা প্রিমিয়ামে ভ্যাট ও কর অব্যাহতি
কৃষি বীমা খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং বাজার ঝুঁকির কারণে কৃষি খাত অত্যন্ত অনিশ্চিত। কৃষি বীমা এই ঝুঁকি মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু বর্তমানে এই খাতে ভ্যাট ও করের বোঝা থাকায় বীমা কোম্পানিগুলো আগ্রহ হারাচ্ছে। কৃষি বীমা প্রিমিয়ামে ভ্যাট এবং এই খাত থেকে অর্জিত আয়ে কর অব্যাহতি প্রদান করলে কৃষকদের সুরক্ষা বাড়বে এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে।
অনলাইন বীমায় ভ্যাট ও কর ছাড়
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মভিত্তিক বীমা পণ্য সম্প্রসারণে কর ও ভ্যাট প্রণোদনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অনলাইন বীমা সেবা সহজলভ্যতা বাড়ায়, পরিচালন ব্যয় কমায় এবং গ্রাহক অভিজ্ঞতা উন্নত করে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বীমা সেবার বিস্তারে এটি কার্যকর মাধ্যম হতে পারে। তাই নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অনলাইন বীমা পণ্যে ভ্যাট ও কর ছাড় প্রদান করলে ডিজিটাল রূপান্তর ত্বরান্বিত হবে।
সামাজিক বীমায় প্রণোদনা
সামাজিক বীমা ও স্বল্পমুনাফাভিত্তিক স্বাস্থ্য বীমা পণ্যে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে প্রণোদনা প্রয়োজন। এসব পণ্যে প্রাথমিক বিনিয়োগ বেশি এবং লাভজনক হতে সময় লাগে। ফলে বেসরকারি খাত স্বাভাবিকভাবে এই খাতে আগ্রহী হয় না। ট্যাক্স হলিডে, ভ্যাট অব্যাহতি এবং সরাসরি আর্থিক সহায়তা প্রদান করলে এই ধরনের সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের উন্নয়ন সম্ভব হবে।
উপসংহার
সার্বিকভাবে বলা যায়, নন-লাইফ বীমা খাতের জন্য একটি ন্যায্য, যুক্তিসঙ্গত এবং সহায়ক কর ও ভ্যাট কাঠামো গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করা হলে শুধু এই খাতই নয়, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিও উপকৃত হবে। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী হবে, বিনিয়োগ বাড়বে এবং একটি টেকসই অর্থনৈতিক পরিবেশ গড়ে উঠবে-যা আগামী দিনের উন্নয়ন যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ফারজানা চৌধুরী : ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা,
গ্রীন ডেল্টা ইনস্যুরেন্স পিএলসি
Comments