ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের আগুনে পুড়ছে আমিরাতের অর্থনীতি
গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান বহুমুখী যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশটির পর্যটন, আবাসন ও বিমান চলাচলের মতো প্রধান খাতগুলোতে। দীর্ঘ দুই দশক ধরে গড়ে তোলা আমিরাতের তথাকথিত 'স্থিতিশীল অর্থনৈতিক মডেল' এখন চরম অস্তিত্ব সংকটে।
গত এক মাসে দুবাই ও আবুধাবির শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর বাজারমূল্য কমেছে প্রায় ১২০ বিলিয়ন (১২ হাজার কোটি) ডলার। যুদ্ধের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দুবাইয়ের শেয়ারবাজার, যার সূচক গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৬ শতাংশ পড়ে গেছে।
একই সময়ে আকাশপথের যোগাযোগ ব্যবস্থায় নজিরবিহীন ধস নেমেছে। গত এক মাসে বাতিল হয়েছে ১৮ হাজার ৪০০টিরও বেশি ফ্লাইট। ১ মার্চ থেকে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পুরোপুরি বন্ধ থাকায় এমিরেটস ও ইতিহাদ এয়ারলাইনস তাদের কার্যক্রম স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে।
নিছক অর্থনৈতিক অস্থিরতা নয়, আমিরাত এখন সরাসরি যুদ্ধের ময়দান। মার্চ মাস পর্যন্ত ইরান আমিরাতকে লক্ষ্য করে ৩৯৮টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র; ১,৮৭২টি ড্রোন; ১৫টি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে।
অধিকাংশ হামলা প্রতিহত করা হলেও বুর্জ আল আরব, পাম জুমেইরাহ, দুবাই বিমানবন্দর এবং ফুজাইরাহর তেল শিল্পাঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব হামলায় অন্তত ১১ জন নিহত এবং ১৭৯ জন বিদেশি নাগরিক আহত হয়েছেন।
দুবাইয়ের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি আবাসন খাত এখন দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে। গোল্ডম্যান স্যাকসের মতে, এক বছরের ব্যবধানে আবাসন লেনদেন কমেছে ৩৭ শতাংশ। দ্রুত বিক্রির জন্য অনেক সম্পত্তি ১০-১৫ শতাংশ কম দামে ছাড়া হচ্ছে। বুর্জ খলিফার নির্মাতা এই প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম কমেছে ২৫ শতাংশের বেশি। দুবাইয়ের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ৪ শতাংশ থেকে কমে ১ শতাংশে নামার আশঙ্কা করছে সিটি ব্যাংক।
২০২৫ সালে ২ কোটির বেশি পর্যটক আসা দুবাই এখন বিদেশি পর্যটকশূন্য হওয়ার পথে। বিশেষ করে ইউরোপীয় পর্যটকরা, যারা মোট পর্যটকের ২০ শতাংশ, তারা এখন আমিরাত এড়িয়ে চলছেন।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে কড়াকড়ি আরোপ করায় বিদেশি বাসিন্দাদের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়েছে। ইরানি হামলার ভিডিও ধারণের অভিযোগে অন্তত ৭০ জন ব্রিটিশ নাগরিককে আটক করা হয়েছে। এ ধরনের ভিডিও শেয়ার করলে ২ লাখ ৬০ হাজার ডলার জরিমানা এবং ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান করেছে কর্তৃপক্ষ। এই পরিস্থিতির কারণে ধনী প্রবাসীরা ব্যক্তিগত বিমানে করে দেশ ছাড়তে শুরু করেছেন।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, তেলের দাম বাড়ায় প্রতিবেশী সৌদি আরব ও ওমান অর্থনৈতিকভাবে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও আমিরাতের চিত্র ভিন্ন। কারণ, আমিরাতের অর্থনীতি শুধু তেলের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং লজিস্টিকস, আর্থিক সেবা এবং বিলাসপণ্যের ওপর দাঁড়িয়ে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় দেশটির প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান ও যুবরাজ শেখ হামদান বিন মোহাম্মদ বিভিন্ন প্রচারণামূলক কর্মসূচির মাধ্যমে আস্থা ফেরানোর চেষ্টা করলেও বিশ্লেষকরা একে 'কঠিন চ্যালেঞ্জ' হিসেবে দেখছেন।
Comments