রংপুরে চার খুন: আলামত নষ্টের অভিযোগ
রংপুরে জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তার পরিবারের চার সদস্যের হত্যাকাণ্ড নিয়ে পুলিশ নতুন করে ব্রিফিং করেছে। ব্রিফিংয়ে হত্যার কারণ, স্থান ও সময় নিয়ে নতুন ভাষ্য দিয়েছে তারা। পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী শ্বাসরোধেই চার জনের মৃত্যু হয়েছে। ধর্ষণের আলামত পাওয়া যায়নি প্রীতিলতা ও আগামী চক্রবর্তীর শরীরে।
গ্রেফতার সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের ডিএনএ পরীক্ষা ও ডোপ টেস্ট করার জন্য আদালতে আবেদন করা হবে। এদিকে গত বুধবার দিবাগত রাতে পুলিশ পাহারায় থাকা গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে পানি ঢেলে আলামত নষ্ট করার অভিযোগ উঠেছে। হত্যার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন ও দ্রুত বিচারের দাবিতে মানববন্ধন এবং সমাবেশ করেছে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। খুনের প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনে গোয়েন্দা সংস্থা ব্যর্থ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
দ্বিতীয় দফা ব্রিফিংয়ে যা বলল পুলিশ
রংপুরের বিদায়ি পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে রংপুর মেট্রোপলিটন সদর দপ্তর মিলনায়তনে এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে দ্বিতীয় দফা সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, মাদকসেবনে বাধা দেওয়ায় পরিবারের প্রত্যেককে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছে মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস। ময়নাতদন্তে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। হত্যাকাণ্ডের পর মুগ্ধ দাস দখিগঞ্জ শ্মশানে আশ্রয় নিয়েছিল বলে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে পাহারাদার বিদ্যুত্ দাস। হত্যাকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ার পাশাপাশি এখন জমি নিয়ে ক্ষোভের বিষয়টিও সামনে আনছে পুলিশ। কমিশনার বলেন, অপর অভিযুক্ত সিদ্ধার্থ দাসের পরিবারের কাছে জমি কিনে গণপতি চক্রবর্তী বাড়ি করায় তাদের পরিবারের সদস্যদের মাঝে জমি বিক্রির টাকা ভাগাভাগি নিয়ে ক্ষোভ থাকার বিষয়টি খতিয়ে দেখছে পুলিশ। এছাড়া, ঐ এলাকায় আশপাশের বেশির ভাগ বাসিন্দাই দাস বর্ণের আর গণপতি চক্রবর্তী ছিলেন ব্রাক্ষণ। এ কারণে তিনি কারো সঙ্গে তেমন মেলামেশা করতেন না। এ বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশ কমিশনার বলেন, নারী ভিকটিম আগামী চক্রবর্তী ও প্রীতিলতা চক্রবর্তী ভ্যাজাইনাল সোয়াব নেওয়া হয়েছিল। সেখানে কোনো ধর্ষণের আলামত পাওয়া যায়নি। গলায় শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হলে মানুষের বীর্য ও মলমূত্র বের হয়ে আসে। আমরা দেখেছি একজন ডোম বলেছিলেন বীর্য পাওয়া গেছে। আসলে ঐ বীর্য ছিল ডেডবডির। তিনি আরো বলেন, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তদন্তে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। গ্রেফতার সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের ডিএনএ পরীক্ষা ও ডোপ টেস্ট করার জন্য আদালতে আবেদন করবেন তারা। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও আসামিদের ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দির তথ্য মিলিয়ে তদন্ত এগিয়ে নেওয়ার কথা বলেছেন তিনি। এদিকে পুলিশ কমিশনার লিখিত বক্তব্য শেষে সাংবাদিকদের মাত্র দুটি প্রশ্নের উত্তর দিয়েই মিলনায়তন ত্যাগ করেন। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন উপস্থিত সাংবাদিকরা।
পানি ঢেলে খুনের আলামত নষ্টের অভিযোগ
হত্যাকাণ্ডস্থল গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ি পানি দিয়ে ধুয়ে আলামত নষ্টের অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। তবে দায়িত্বরত পুলিশ বলছে, এ অভিযোগ সঠিক নয়। গত বুধবার রাত ১০টার দিকে অভিযোগটি করে হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার সিদ্ধার্থের পরিবার। সিদ্ধার্থের ভাই পার্থ দাস অভিযোগ করে বলেন, গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির লাইট অব করে আলামত নষ্ট করা হচ্ছে। পানি ঢেলে ধুয়ে ফেলা হচ্ছে আলামত। তার ভাই সিদ্ধার্থকে ফাঁসানো হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি। এ অভিযোগ প্রসঙ্গে দায়িত্বরত এসআই আব্দুল হাকিম বলেন, ভুল করে মটারের সুইচ অন করা হয়েছিল। যখন ট্যাংকির পানি ভর্তি হয়েছে তখন সেটা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অন্য কিছু না। যারা বলছে আলামত নষ্ট করা হয়েছে, এমন তথ্য সঠিক না। গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে পানি প্রসঙ্গে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী বলেন, এখানে ২৪ ঘণ্টা পুলিশ পাহারা দিচ্ছে। আলামত নষ্ট করার অভিযোগ একেবারে অবান্তর। কেননা আলমত লাশ উদ্ধারের সময় সংরক্ষণ করা হয়েছে।
মামলার সাক্ষী সীমান্তর আদালতে জবানবন্দি
এ ঘটনায় আদালতে প্রথম সাক্ষী হিসেবে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন সীমান্ত চন্দ্র দাস নামের এক যুবক। সে এই মামলায় পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়া প্রধান দুই আসামির বন্ধু। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গ্রেফতার আসামিদের দেওয়া জবানবন্দির সঙ্গে সাক্ষী সীমান্তের বর্ণনার ইয়াবা সেবনের বিষয়ে মিল পাওয়া গেছে। হত্যাকাণ্ডের রাতে আসামিরা যে সীমান্তের বাসায় ইয়াবা সেবন করেছিল, আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে সে বিষয়টিও উঠে এসেছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রংপুরের মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের বিচারক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলামের কাছে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় সীমান্তের জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। সীমান্ত চন্দ্র দাস নগরীর মাছুয়াপাড়া (দাসপাড়া) এলাকার সুবাস চন্দ্র দাসের ছেলে। সে নগরের একটি মার্কেটে কাপড়ের দোকানে বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করে।
গত শনিবার রাতে রংপুর জিলা স্কুলের ইংরেজি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর (৬৫) বাসা থেকে তিনিসহ তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী বালা (৫০), স্নাতকোত্তর শ্রেণির শিক্ষার্থী মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৫) এবং পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়মের (১২) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় রবিবার ভোরে একই এলাকা থেকে কানু দাসের ছেলে মুগ্ধ দাস (২৩) ও বিনয় চন্দ্র দাসের ছেলে সিদ্ধার্থ দাসকে (১৯) গ্রেফতার করে পুলিশ। মামলাটির তদন্তভার বর্তমানে কোতোয়ালি থানা পুলিশ থেকে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হাতে দেওয়া হয়েছে। মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের পরিদর্শক জিনাত আলী মামলাটি তদন্ত করছেন।
পুলিশ নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ :সুজন
এই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন ও দ্রুত বিচারের দাবিতে মানববন্ধন এবং সমাবেশ করেছে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। গতকাল দুপুরে নগরীর রংপুর প্রেস ক্লাবের সামনে এ কর্মসূচিতে ইয়ুথ এন্ডিং হাঙ্গারসহ আরো কয়েকটি সংগঠন যোগ দেয়। মানববন্ধনে মহানগর সুজনের সভাপতি জোবায়দুল ইসলাম বুলেট বলেন, এ ঘটনায় আমরা আতঙ্কিত, শঙ্কিত। সারা বাংলাদেশের কেউ নিরাপদ নই। আমরা মনে করছি, পুলিশ সংশোধন হয়নি। তারা নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। পাড়া-মহল্লায় নাগরিকরা অরক্ষিত অবস্থায় জীবন দিচ্ছে। সুজনের জেলা সভাপতি ফখরুল আনাম বেনজু বলেন, সেদিন বিদ্যুতের তার কেটে ফেলা হয়েছে, সেই তার শ্যামাসুন্দরী খালে ফেলে দেওয়া হয়েছে। অথচ সেটি আলামত হিসেবে নেওয়া হয়নি। এছাড়া, থানার ওসি যে কথা বলেছে, সেটির সঙ্গে কোনো মিল নেই মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের বক্তব্যে। অবিলম্বে এই অমানবিক হত্যার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনসহ নেপথ্যে কারা জড়িত রয়েছে—তা উন্মোচনের দাবি জানান তিনি।
হত্যাকাণ্ড নিয়ে ধোঁয়াশা কাটছে না :জামায়াত
দুপুরে রংপুর নগরীর শাপলা চত্বরস্থ জামায়াতের দলীয় কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, একটি শিক্ষিত, ভদ্র পরিবারের চার জনকে হত্যা করা হলো। সরকার হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে গোয়েন্দা সংস্থার পেছনে। অথচ এমন হত্যাকাণ্ড ঘটল, আজও এর সঠিক ক্লু বের করা গেল না। গোয়েন্দা সংস্থা হত্যাকাণ্ডের সঠিক ক্লু বের করতে ব্যর্থ হয়েছে। হত্যাকাণ্ড নিয়ে ধোঁয়াশা এখনো কাটছে না। এটি আমাদের উদ্বেগের বিষয়। অবিলম্বে প্রশাসনকে হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য উদ্ঘাটন, জড়িতদের খুঁজে বের করার জন্য জোর দাবি জানাচ্ছি।
Comments