ঋণনির্ভর বাজেটের পথে: স্বস্তি নাকি ভবিষ্যৎ ঝুঁকি?
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘুরানোর মুহূর্ত সামনে উপস্থিত। প্রায় দুই দশক পর নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি বড় আকারের বাজেট উপস্থাপনের প্রস্তুতি চলছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের সম্ভাব্য বাজেটের আকার ৯ লাখ কোটি টাকার বেশি করার যে চিন্তা করা হচ্ছে, তা নিঃসন্দেহে উচ্চাভিলাষী। তবে এই উচ্চাভিলাষের আড়ালে যে বাস্তবতা লুকিয়ে আছে, তা হলো রাজস্ব আদায়ে দুর্বলতা এবং বাড়তি ব্যয় মেটাতে ঋণের ওপর অতি নির্ভরতা।
সরকারের ব্যয় বাড়ানোর পরিকল্পনার পেছনে রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিশ্রুতির বড় ভূমিকা রয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, কৃষিঋণের সুদ মওকুফ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ-এসব উদ্যোগ নিঃসন্দেহে জনকল্যাণমূলক। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই ব্যয় নির্বাহের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ কোথা থেকে আসবে? রাজস্ব আয় বাড়ানোর যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে তাও বেশ বড়। প্রায় এক লাখ কোটি টাকা অতিরিক্ত আদায়ের লক্ষ্য বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
বাংলাদেশের করব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই নানা সীমাবদ্ধতায় ভুগছে। করজালের পরিধি তুলনামূলক ছোট, কর ফাঁকি একটি বড় সমস্যা, এবং প্রশাসনিক দক্ষতার ঘাটতিও রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে হঠাৎ করে রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো সহজ কাজ নয়। বিশেষ করে ভ্যাটের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা সাধারণ জনগণের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়াতে পারে।
অন্যদিকে, বাজেট ঘাটতি জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশে পৌঁছানোর আশঙ্কা অর্থনীতির জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা উচিত। অর্থনীতির একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত ঘাটতি গ্রহণযোগ্য হলেও, সেটি যদি ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকে, তবে তা আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। প্রায় পৌনে তিন লাখ কোটি টাকার ঋণনির্ভর ঘাটতি পূরণ মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর ঋণের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া।
বিশেষ করে ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা উদ্বেগজনক। সরকার যদি ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেয়, তাহলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হতে বাধ্য, যাকে অর্থনীতির ভাষায় "ক্রাউডিং আউট" বলা হয়। এর ফলে বিনিয়োগ কমে যেতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বিদেশি ঋণও সহজ সমাধান নয়। যদিও বিদেশি ঋণের সুদের হার তুলনামূলক কম, তবে এর সঙ্গে থাকে মুদ্রাবিনিময় ঝুঁকি ও শর্তসাপেক্ষতা। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ থাকলে এই ঋণ পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এদিকে সরকারের ব্যয়ের বড় একটি অংশ এখন সুদ পরিশোধে চলে যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরে ১ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা সুদ পরিশোধের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছিল, যা আগামী বছর আরও বাড়বে। অর্থাৎ, নতুন ঋণ নেওয়া মানেই ভবিষ্যতে আরও বেশি সুদ পরিশোধের দায় তৈরি হওয়া। এটি একটি চক্র, যা থেকে বের হওয়া কঠিন।
সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন এবং উন্নয়ন প্রকল্পের আকার বাড়ানোর পদক্ষেপও ব্যয়ের চাপ বাড়াবে। যদিও এগুলো অর্থনীতিতে চাহিদা সৃষ্টি করতে পারে, তবে যদি উৎপাদনশীলতা না বাড়ে, তাহলে তা কেবল মুদ্রাস্ফীতি বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করবে।
এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে জরুরি হলো একটি বাস্তবসম্মত ও ভারসাম্যপূর্ণ বাজেট প্রণয়ন। শুধুমাত্র ব্যয় বাড়িয়ে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা নয়, বরং সেই ব্যয়ের টেকসই অর্থায়নের পথ নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য। কর সংস্কার, কর প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি, কর ফাঁকি রোধ এবং করজাল সম্প্রসারণ-এসব বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া রাজস্ব আয় বাড়ানো সম্ভব নয়।
একই সঙ্গে ব্যয়ের ক্ষেত্রেও অগ্রাধিকার নির্ধারণ জরুরি। অপ্রয়োজনীয় ও কম ফলপ্রসূ প্রকল্প বাদ দিয়ে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো-এই খাতগুলোতে বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে।
সবশেষে বলা যায়, বড় বাজেট মানেই সফল বাজেট নয়। বাজেটের সাফল্য নির্ভর করে তার বাস্তবায়নযোগ্যতা, স্বচ্ছতা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের ওপর। ঋণনির্ভর ব্যয় যদি সঠিকভাবে পরিচালিত না হয়, তবে তা সাময়িক স্বস্তি দিলেও ভবিষ্যতে বড় ধরনের আর্থিক সংকটের কারণ হতে পারে।
অতএব, সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো-উচ্চাভিলাষ আর বাস্তবতার মধ্যে সঠিক ভারসাম্য খুঁজে বের করা। সেই ভারসাম্যই নির্ধারণ করবে এই বাজেট দেশের জন্য আশীর্বাদ হবে, নাকি ভবিষ্যতের জন্য একটি নতুন বোঝা।
Comments