ঋণ ও মানসিক চাপে ইতালিতে প্রবাসীর আত্মহত্যা, লাশ ফেরাতে সহায়তার আকুতি
সংসারের অভাব দূর করা, তিন কন্যার মুখে হাসি ফোটানো আর পরিবারের ভাগ্যের চাকা ঘোরানোর স্বপ্ন নিয়ে ইউরোপে পাড়ি জমিয়েছিলেন বাগেরহাট সদর উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নের শিমুলতলা গ্রামের বাসিন্দা জিন্নাত খান খোকন। কিন্তু সেই স্বপ্নপূরণের লড়াই শেষ হয়েছে এক হৃদয়বিদারক পরিণতিতে। ইতালিতে চরম হতাশা ও ঋণের চাপে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন তিনি।
নিহত জিন্নাত খান খোকন শিমুলতলা গ্রামের মৃত লুৎফর রহমান খানের ছেলে। দেশে তার বৃদ্ধা মা, স্ত্রী এবং তিনটি কন্যাসন্তান রয়েছে। শুক্রবার (১৯ জুন) ইতালিতে তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, উন্নত জীবনের আশায় দালালের মাধ্যমে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা খরচ করে খোকন প্রথমে বৈধভাবে বুলগেরিয়ায় যান। পরবর্তীতে ঝুঁকিপূর্ণ পথে অবৈধভাবে প্রবেশ করেন ইতালিতে। বিদেশ যাত্রার ব্যয় মেটাতে নিজের বসতভিটাসহ শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করতে হয়েছিল তাকে। পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নিয়েছেন চড়া সুদের ঋণ।
২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর দেশ ছাড়ার পর থেকে খোকনের ভাগ্যের চাকা আর ঘোরেনি। বরং ঋণের পাহাড়, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে তীব্র দুশ্চিন্তায় তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। অবশেষে গত শুক্রবার সকালে এই অকাল মৃত্যুতে নিভে গেল একটি পরিবারের একমাত্র আশা।
মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকেই শোকের মাতম চলছে খোকনের বাড়িতে। ছেলের লাশ শেষবারের মতো দেখার অপেক্ষায় বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন তার বৃদ্ধা মা। কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি বলেন, "যাবার সময় ও আমাকে চুমু খেয়ে বলেছিল, তোমাকে অনেক টাকা দিব, চিকিৎসা করাবো। আমার ছেলে সংসারের সুখের জন্য বিদেশ গিয়েছিল, কিন্তু আজ ও নেই। আমি শুধু আমার ছেলের লাশটা দেখতে চাই। সরকারের কাছে আমার একটাই আকুতি, আমার ছেলেকে দেশে আনার ব্যবস্থা করা হোক।"
নিহতের স্ত্রী সুমি বেগম বলেন, "স্বামীর স্বপ্ন পূরণে আমরা ভিটেমাটি বিক্রি করে নিঃস্ব হয়েছি। এখন তার লাশ দেশে আনার মতো সামর্থ্যও আমাদের নেই। তিনটি ছোট মেয়েকে নিয়ে এখন আমি কোথায় যাবো, কী খাবো?"
স্বজনরা জানান, ইতালি থেকে খোকনের লাশ দেশে আনতে আনুমানিক ৭ লাখ টাকা প্রয়োজন। এই বিশাল পরিমাণ অর্থ জোগাড় করা শোকার্ত পরিবারের পক্ষে অসম্ভব। প্রিয়জনের শেষ বিদায়টুকু জানাতে স্থানীয়রা এখন সরকারের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং সমাজের বিত্তবান মানুষের কাছে মানবিক সহায়তার আবেদন জানিয়েছেন।
একটি পরিবারের স্বপ্ন আজ ধূলিসাৎ। এখন সেই পরিবারের একমাত্র চাওয়া—আইনি প্রক্রিয়া ও আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে খোকনের লাশ যেন দ্রুত তার জন্মভূমিতে পৌঁছে দেওয়া হয়।
Comments