পাবনার রমা থেকে যেভাবে ‘মহানায়িকা’ সুচিত্রা সেন
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তিনি এক অনন্য ধ্রুবতারা। যার চোখের চাহনি আর ভুবনভোলানো হাসি আজও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে দাগ কেটে যায়। তিনি মহানায়িকা সুচিত্রা সেন। আজ এই কিংবদন্তি অভিনেত্রীর শুভ জন্মদিন। ১৯৩১ সালের এই দিনে পাবনা জেলার সদর উপজেলার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম নিয়েছিলেন তিনি।
পাবনার শৈশব পেরিয়ে দেশভাগের ঠিক আগে সপরিবারে কলকাতায় চলে যান তৎকালীন রমা দাশগুপ্ত। পরিবারের ইচ্ছায় শিল্পপতি আদিনাথ সেনের ছেলে দিবানাথ সেনের সঙ্গে বিয়ের পিঁড়িতে বসেন তিনি। বিয়ের পর স্বামীর উৎসাহেই সিনেমার রূপালি জগতে পা রাখেন রমা।
১৯৫২ সালে 'সাত নম্বর কয়েদী' সিনেমার মাধ্যমে তার রূপালি যাত্রা শুরু হলেও নিজের নাম বদলে 'সুচিত্রা সেন' হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন ১৯৫২ সালেরই 'কাজরী' সিনেমার মাধ্যমে। তবে তার ভাগ্য বদলে যায় ১৯৫৩ সালে; 'সাড়ে চুয়াত্তর' সিনেমায় উত্তম কুমারের সঙ্গে জুটি বাঁধার পর। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে।
উত্তম-সুচিত্রা জুটি বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এক সোনালী অধ্যায়ের নাম। তাদের রসায়নে সমৃদ্ধ হয়েছে 'হারানো সুর', 'সপ্তপদী', 'পথে হলো দেরি', 'শাপ মোচন' ও 'সাগরিকা'র মতো কালজয়ী সিনেমাগুলো। এছাড়া 'দেবী চৌধুরানী', 'দত্তা' কিংবা 'গৃহদাহ'র মতো সাহিত্যধর্মী কাজেও তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী।
সুচিত্রা সেন কেবল বাংলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। ১৯৫৫ সালে বলিউডের 'দেবদাস' ছবিতে দিলীপ কুমারের বিপরীতে পার্বতী (পারু) চরিত্রে অভিনয় করে তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর সম্মাননা জেতেন। পরবর্তীতে 'মমতা' ও 'আঁধি' সিনেমার মাধ্যমে হিন্দি চলচ্চিত্র জগতেও নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেন।
সুচিত্রা সেনই প্রথম ভারতীয় অভিনেত্রী, যিনি কোনো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কৃত হন। ১৯৬৩ সালে 'সপ্তপদী' সিনেমার জন্য মস্কো ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে তিনি সেরা অভিনেত্রীর শিরোপা জয় করেন।
১৯৭৮ সালে 'প্রণয় পাশা' মুক্তির পর দীর্ঘ ২৫ বছরের অভিনয় জীবনের ইতি টানেন এই মহানায়িকা। এরপর তিনি বেছে নেন এক রহস্যময় নিভৃত জীবন। জনসমক্ষে আসা তো দূরের কথা, ২০০৫ সালে ভারতের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র সম্মান 'দাদাসাহেব ফালকে' পুরস্কার নিতেও তিনি অস্বীকৃতি জানান লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকবেন বলে। ২০১২ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের দেওয়া 'বঙ্গ বিভূষণ' পুরস্কারটি তার হয়ে গ্রহণ করেন কন্যা মুনমুন সেন।
২০১৪ সালের ১৭ জানুয়ারি দীর্ঘ নিভৃতবাস শেষে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান এই কিংবদন্তি। তার রক্তধারা বয়ে নিয়ে চলেছেন কন্যা মুনমুন সেন এবং দুই নাতনি রিয়া ও রাইমা সেন—যারা প্রত্যেকেই বিনোদন জগতের পরিচিত মুখ।
Comments