৩৬৫ পুকুরের রহস্য: রানির গোসল, নাকি প্রাচীন বাংলার জলব্যবস্থা?
একটি গ্রাম, পাশাপাশি সারি সারি অসংখ্য পুকুর। কোথাও সবুজ গাছের ছায়া, কোথাও শান্ত পানিতে আকাশের প্রতিচ্ছবি। দেখলে মনে হবে, প্রকৃতি আর ইতিহাস যেন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। নওগাঁর ধামইরহাট উপজেলার ইসবপুর ইউনিয়নের চক-চান্দিরা গ্রামের এই জায়গাটির পরিচিতি ৩৬৫ পুকুরের গ্রাম হিসেবে। ৬ নভেম্বর সরেজমিনে ঘুরে এসে মনে হয়েছে, এটি দর্শনীয় স্থানের পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রাচীন ইতিহাসের এক অনাবিষ্কৃত অধ্যায়। সঙ্গে ছিলেন ঢাকা জার্নালের নওগাঁ প্রতিনিধি মোঃ আশরাফুল ইসলাম রিয়ান।
স্থানীয় লোককথা বলছে, অষ্টম শতাব্দীতে এখানে রাজত্ব করতেন পালবংশের রাজা চণ্ডীলাল পাল। তাঁর রানি এক কঠিন রোগে আক্রান্ত হলে রাজ্যের চিকিৎসকেরা পরামর্শ দেন, বছরের প্রতিদিন আলাদা একটি পুকুরে তাঁকে গোসল করাতে হবে। রানির সুস্থতার জন্য রাজা খনন করান ৩৬৫টি পুকুর। সেই থেকে রানির গোসলের গল্প ছড়িয়ে পড়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।
কিন্তু ইতিহাসের সঙ্গে এই গল্পের মিল কতটুকু? রাজা চণ্ডীলাল পালের অস্তিত্ব, তাঁর রাজপ্রাসাদ বা রানির অসুস্থতার পক্ষে এখন পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক দলিল পাওয়া যায়নি।
একসঙ্গে খনন হয়নি সব পুকুর?
ধামইরহাট এম এম ডিগ্রি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও স্থানীয় ইতিহাস গবেষক শহিদুল ইসলাম মনে করেন, পুকুরগুলো পাল শাসনামলে, সম্ভবত দেবপাল অথবা মহীপালের সময়ে খনন করা হয়ে থাকতে পারে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রায় ৫০ বছর আগেও চক-চান্দিরা ও ধুরল গ্রামের মাঝামাঝি একটি ঢিবি ছিল। স্থানীয় লোকজন সেখান থেকে ইট খুলে নিয়ে যাওয়ায় সম্ভাব্য প্রাচীন স্থাপনার চিহ্ন হারিয়ে গেছে। পুকুরগুলোর কয়েকটিতে একসময় ইটের বাঁধানো ঘাটও ছিল।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোস্তাফিজুর রহমানের গবেষণায় বলা হয়েছে, সব পুকুর একই সময়ে খনন করা হয়নি। উত্তর-দক্ষিণমুখী পুকুরগুলোর কিছু পাল আমলের এবং পূর্ব-পশ্চিমমুখী পুকুরগুলোর কিছু পরবর্তী মুসলিম শাসনামলে, সম্ভবত মোগল আমলে খনন করা হয়েছিল।
তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বরেন্দ্র অঞ্চলে একসময় পানির সংকট ছিল। জনবসতি, কৃষিকাজ, পানীয় জল এবং দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে শাসকেরা বড় বড় পুকুর খনন করতেন। পুকুরগুলো ছিল একটি জনকল্যাণমূলক পানি ব্যবস্থাপনার অংশ।
নদীর পাশে এত পুকুর কেন?
চক-চান্দিরা গ্রামের পাশেই রয়েছে ঘুকশির বিল ও ঘুকশি নদী। স্থানীয় ইতিহাস গবেষক শহিদুল ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় ঘুকশি নদী ছিল বেশ প্রবাহমান এবং এ অঞ্চলের জনজীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। তবে একটি প্রশ্ন গবেষণা ও অনুসন্ধানী দলের কাছে মনে হয়েছে, নদী ও বিলের এত কাছে থাকার পরও কেন এতগুলো পুকুর খনন করা হয়েছিল? এর কারণ হতে পারে, নদীর পানি সব সময় পানযোগ্য ছিল না। বর্ষা ও শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রাপ্যতা, কৃষিকাজ, বসতবাড়ির প্রয়োজন এবং নিরাপদ পানির সংস্থান নিশ্চিত করতে পুকুর খনন করা হয়ে থাকতে পারে। তবে এটি এখনো গবেষণার বিষয়, প্রতিষ্ঠিত সিদ্ধান্ত নয়।
পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার জাদুঘরের তত্ত্বাবধায়ক প্রত্নতত্ত্ববিদ ফজলুল করিমের বক্তব্য অনুযায়ী, পুকুরগুলো কে বা কখন খনন করেছেন, তা নিশ্চিত করার মতো প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ নেই। অন্যদিকে বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের পরিচালক ড. আলী রেজা মুহম্মদ আবদুল মজিদ জানিয়েছেন, তাঁদের জাদুঘরের তত্ত্বাবধানে এ পুকুরগুলো নিয়ে কোনো গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়নি।
বর্তমানে রামপ্রসাদ থেকে কামারপাড়া গ্রামের ত্রিমোহনী পর্যন্ত প্রায় ছয় কিলোমিটার এলাকায় পুকুরগুলোর বিস্তৃতি। একসময় স্থানীয় মানুষের গোসল, কাপড় ধোয়া ও অন্যান্য প্রয়োজনে ব্যবহৃত এসব জলাশয়ের অনেকগুলো এখন মাছ চাষের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় কিছু পুকুর লিজ দেওয়া হয়েছে। পুকুরপাড়ে বন বিভাগের উদ্যোগে বনায়নও করা হয়েছে।
Comments