শ্রমিক বিক্ষোভে উত্তপ্ত সাভার-গাজীপুর, ৮০ কারখানা ছুটি ঘোষণা
ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে রাজধানীর উপকণ্ঠ সাভার ও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ অব্যাহত রেখেছেন তৈরি পোশাকশ্রমিকরা। শ্রমিক অসন্তোষ ও নিরাপত্তাজনিত পরিস্থিতির কারণে দুই জেলায় অন্তত ৮০টি পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।
রোববার (১ নভেম্বর) সকালে পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাভারের বিভিন্ন এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ স্থান ও কারখানার সামনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। সাভারে অর্ধশতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া।
প্রত্যক্ষদর্শী ও শিল্প পুলিশের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, সকালে অধিকাংশ কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক ছিল। তবে নিশ্চিতপুর এলাকার আল-মুসলিম অ্যাপারেলস, নিউএইজ গ্রুপের কয়েকটি কারখানা এবং ট্রাউজার লাইন লিমিটেডের শ্রমিকদের একটি অংশ কাজ বন্ধ রেখে কারখানার ভেতরে অবস্থান নেন।
এদিকে সকাল পৌনে ১১টার দিকে আশুলিয়ার নরসিংহপুর এলাকায় শারমিন গ্রুপের কারখানার সামনে আব্দুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়কে অবস্থান নেন বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা। এ সময় বেতন বাড়ানোর দাবিতে স্লোগান দেন তারা।
পরিস্থিতি সামাল দিতে শিল্প পুলিশের সদস্যরা শ্রমিকদের সড়ক ছেড়ে এক পাশে অবস্থান নেওয়ার অনুরোধ জানান। পরে শ্রমিকরা সড়কের পাশে সরে যান এবং শারমিন গ্রুপের অন্য শ্রমিকদেরও আন্দোলনে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দুপুর পৌনে ১২টার দিকে শারমিন গ্রুপের কারখানায় ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। একই এলাকার হা-মীম গ্রুপ, নিউএইজসহ আশপাশের আরও কয়েকটি কারখানাও বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খায়রুল মামুন জানান, কাজ বন্ধ রেখে কারখানায় অবস্থান করা শ্রমিকদের সঙ্গে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে দাবিদাওয়া নিয়ে কার্যকর কোনো আলোচনা হয়নি বলে তাঁকে জানিয়েছেন কয়েকজন শ্রমিক। এতে নিজেদের দাবি ও পরবর্তী সিদ্ধান্ত সম্পর্কে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন তারা।
তিনি বলেন, কোনো কারখানায় কাজ বন্ধের কারণে ছুটি ঘোষণা করা হলে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। দাবির বিষয়ে স্পষ্ট বক্তব্য না পেলে তারা সড়কে নেমে অন্য কারখানার শ্রমিকদেরও আন্দোলনে যুক্ত করার চেষ্টা করেন। পরিস্থিতি এড়াতে দ্রুত শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনায় বসার আহ্বান জানান তিনি।
এদিকে সকাল ১০টার দিকে আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল পুলিশের পক্ষ থেকে বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং করা হয়। এতে শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও শিল্পাঞ্চলের শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশের সহযোগিতার কথা জানানো হয়। পাশাপাশি শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের বিষয়েও পাশে থাকার আশ্বাস দেওয়া হয়।
অন্যদিকে, গাজীপুরের কালিয়াকৈরেও শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। উপজেলার চন্দ্রা পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় একটি পোশাক কারখানার ঝুটের গোডাউন ও একটি পিকআপ ভ্যানে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। বেলা সাড়ে ১১টা থেকে সাড়ে ১২টার মধ্যে এসব ঘটনা ঘটে। শ্রমিক অসন্তোষের কারণে কালিয়াকৈর এলাকায় অন্তত ৩০টি পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
সকালে কালিয়াকৈরের রতনপুর এলাকার করনী নিট কম্পোজিট, নিট এশিয়াসহ আশপাশের কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরা কাজে যোগ না দিয়ে সফিপুর বাজার এলাকায় মহাসড়কে অবস্থান নেন। কারখানায় হাজিরা দেওয়ার পরই তারা বিক্ষোভ শুরু করেন। এ পরিস্থিতিতে আশপাশের আরও কয়েকটি কারখানা বন্ধ ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় একটি পিকআপ ভ্যানে আগুন দেওয়া হয়। আন্দোলনকারীদের বাধার কারণে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে না পারায় গাড়িটি পুড়ে যায়। এর কিছুক্ষণ পর একই এলাকায় ট্রপিক্যাল নামের একটি পোশাক কারখানার ঝুটের গোডাউনে আগুন দেওয়া হয়।
খবর পেয়ে কালিয়াকৈর ফায়ার সার্ভিসের একটি ইউনিট ঘটনাস্থলে যাওয়ার চেষ্টা করলেও আন্দোলনরত শ্রমিকদের বাধার মুখে পড়ে।
কালিয়াকৈর ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন কর্মকর্তা মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, চন্দ্রা পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় ট্রপিক্যাল কারখানার গোডাউনে অগ্নিসংযোগের খবর পেয়েছেন তারা। তবে শ্রমিক আন্দোলনের কারণে ঘটনাস্থলে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না।
গাজীপুর শিল্পাঞ্চল পুলিশের পুলিশ সুপার আমজাদ হোসেন জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে। শ্রমিক অসন্তোষের কারণে জেলার বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ৩০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
Comments