১৯০ শিশুকে অনাহারে হত্যার দায়ে কেনিয়ায় ধর্মীয় নেতা ২০০ বছরের কারাদণ্ড
কেনিয়ার আলোচিত শাকাহোলা বন হত্যাকাণ্ডে ১৯০ শিশুকে অনাহারে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার ঘটনায় ধর্মীয় গোষ্ঠীর নেতা পল ম্যাকেঞ্জিকে ২০০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। আধুনিক সময়ে ধর্মীয় উগ্রবাদকে কেন্দ্র করে সংঘটিত ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডগুলোর মধ্যে এ ঘটনাকে অন্যতম হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এ ঘটনায় সব মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) রায় ঘোষণার সময় বিচারক ডায়ানা কাভেজা জানান, অনাহারে মৃত্যুর ঘটনায় ১০০ বছর এবং হত্যার অপরাধে আরও ১০০ বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে ম্যাকেঞ্জিকে। অর্থাৎ তাঁকে মোট ২০০ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের তথ্য অনুযায়ী, পূর্ব কেনিয়ার ভারত মহাসাগরীয় উপকূলের কাছাকাছি একটি জঙ্গলে খ্রিস্টান ধর্মীয় গোষ্ঠী পরিচালনা করতেন ম্যাকেঞ্জি। অনুসারীদের তিনি বিশ্বাস করাতেন, পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার আগেই স্বর্গে পৌঁছাতে হলে নিজেদের পাশাপাশি সন্তানদেরও অনাহারে মৃত্যুবরণ করতে হবে। তাঁর এই উগ্র নির্দেশ অনুসরণ করতে গিয়ে বহু মানুষ ও শিশু প্রাণ হারায়। পরে তাদের মরদেহ জঙ্গলের বিভিন্ন স্থানে মাটিচাপা দেওয়া হয়।
ম্যাকেঞ্জির সহযোগীরাও অনুসারীদের ওপর নির্যাতন চালাতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁর নির্দেশ অমান্য না করতে ভয়ভীতি দেখানো ও মারধর করা হতো। উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর মধ্যে কিছু পাওয়া যায় অগভীর কবর ও শৌচাগারে। কয়েকজনকে জীবন্ত কবর দেওয়ার প্রমাণও পেয়েছেন তদন্তকারীরা।
আদালতের বাইরে একটি তাঁবুতে রায় ঘোষণার সময় ম্যাকেঞ্জিকে নির্বিকার থাকতে দেখা যায়। তাঁর পরনে ছিল ধূসর রঙের পোলো শার্ট ও কালো ট্রাউজার। তবে শুরু থেকেই হত্যার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন তিনি। তাঁর দাবি, কাউকে অনাহারে থাকতে বাধ্য করেননি।
আদালত তাঁর বক্তব্য গ্রহণ করেননি। একই মামলায় ম্যাকেঞ্জির ২৮ সহযোগীকেও ১০ থেকে ১৬০ বছর পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। গত মাসে বিচার শেষে তাঁদের দোষী সাব্যস্ত করা হয়।
ম্যাকেঞ্জি ও অন্য দণ্ডিতদের পক্ষে আইনি লড়াই করা আইনজীবী লরেন্স ওবনিও জানিয়েছেন, এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হবে।
বিচারক কাভেজা তাঁর পর্যবেক্ষণে বলেন, ম্যাকেঞ্জি ইউটিউব চ্যানেলের মাধ্যমে ধর্মীয় বক্তব্য প্রচার করতেন। সেখানে তাঁর হাজার হাজার অনুসারী ছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে মানুষের বিশ্বাস অর্জন করতেন তিনি। পরবর্তী সময়ে সমাজের অসহায় ও দুর্বল মানুষ, বিশেষ করে শিশুদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেন।
বিচারকের ভাষ্য অনুযায়ী, শিশুরা দিনের পর দিন ক্ষুধার যন্ত্রণা সহ্য করেছে। তাদের চোখের সামনে ভাই-বোনদের মৃত্যু হয়েছে। খাবার কিংবা পানি সংগ্রহের চেষ্টা করলেও তাদের মারধর করা হতো। অনেক শিশুকে হাত বেঁধে ঘরের ভেতর আটকে রাখা হয়েছিল। এসব ঘর কার্যত অনাহারে মৃত্যুর বন্দিশালায় পরিণত হয়েছিল।
২০২৩ সালের এপ্রিলে কেনিয়ার এ ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। উপকূলীয় শহর মালিন্দির কাছের শাকাহোলা বন থেকে পুলিশ ধারাবাহিকভাবে মরদেহ উদ্ধার করতে শুরু করে। মামলার বিচারপ্রক্রিয়ায় ১৯০ শিশু ও একজন প্রাপ্তবয়স্কের মৃত্যুর বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
তবে কেনিয়া জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, শাকাহোলা বন থেকে মোট ৪৪৮টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর বাইরে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরের একটি গ্রামে আরও ৫২ জনের মৃত্যুর ঘটনায় ম্যাকেঞ্জিকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। সব মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এসব অতিরিক্ত মৃত্যুর অভিযোগেও নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন তিনি।
এই হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতার সঙ্গে ২০০০ সালে উগান্ডায় একটি উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠীর হাতে ৭০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যুর ঘটনার তুলনা করা হচ্ছে। একইভাবে ১৯৭৮ সালে গায়ানার জোনসটাউন গণহত্যার কথাও সামনে এসেছে। ওই ঘটনায় ধর্মীয় গোষ্ঠীর নেতা জিম জোনসের নির্দেশে বিষপানে ৯০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।
ম্যাকেঞ্জির নির্দেশে প্রাণ হারানো ছয় শিশুর বাবা ৪৮ বছর বয়সী স্টিফেন মউইটি। তাঁর স্ত্রীও এ মামলায় সাজাপ্রাপ্তদের একজন। মউইটির অভিযোগ, তাঁর স্ত্রীই সন্তানদের শাকাহোলা বনে নিয়ে গিয়েছিলেন, যেখানে তাদের অনাহারে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়।
রায় ঘোষণার আগে ক্ষোভ প্রকাশ করে মউইটি বলেন, প্রাপ্তবয়স্করা নিজেদের ইচ্ছায় উপবাস করতে রাজি হলেও শিশুদের কী অপরাধ ছিল?
অন্যদিকে স্ত্রী ও ছয় সন্তানের সন্ধান এখনো পাননি সুলেমান জিরো। রায় ঘোষণার পর কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি সরকারের কাছে পরিবারের সন্ধান দেওয়ার আবেদন জানান। পরিবারের সদস্যরা মারা গিয়ে থাকলে অন্তত তাঁদের মরদেহ ফেরত দেওয়ার অনুরোধ করেন তিনি।
ম্যাকেঞ্জির ছেলে ড্যান জানিয়েছেন, কৈশোরেই তিনি ওই ধর্মীয় গোষ্ঠী ছেড়ে পালিয়ে আসেন। সেখানে তিনি নিজের বন্ধু ও ছোট ভাইকে হারিয়েছেন। তাঁর মতে, আদালতের এ রায় নিহতদের জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
২০১৭ সাল থেকেই পুলিশের নজরদারিতে ছিলেন ম্যাকেঞ্জি। ২০১৯ সালে তাঁর গির্জা বন্ধ করে দেওয়া হলেও পরবর্তী সময়ে শাকাহোলা বনে ধর্মীয় কার্যক্রম চালিয়ে যান তিনি।
এ ঘটনার পর কেনিয়ায় উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রমের ওপর কঠোর নজরদারির দাবি ওঠে। তবে এ-সংক্রান্ত বেশ কিছু প্রস্তাব এখনো আইনে পরিণত হয়নি।
কেনিয়া মানবাধিকার কমিশনের কর্মকর্তা ওজিরো ওধিয়াম্বোর অভিযোগ, স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো একাধিকবার সতর্কবার্তা পেয়েও কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। এ ব্যর্থতার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
বিচারক কাভেজাও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার বিষয়টি তুলে ধরে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ২০২৩ সালে কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম রুটোও হত্যাকাণ্ডটি ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়ার দায় স্বীকার করেছিলেন।
Comments