বরেন্দ্র অঞ্চলে নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার
বরেন্দ্র অঞ্চলের পানিসংকট মোকাবিলা এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে ১ হাজার ২০৩ কোটি ৭৩ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর আওতায় রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৬ জেলার ১২৩টি উপজেলায় পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
'বরেন্দ্র অঞ্চলে নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন প্রকল্প' শীর্ষক উদ্যোগটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব দিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই) ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০৩০ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। এর সম্পূর্ণ ব্যয় সরকারি অর্থায়নে মেটানোর প্রস্তাব রয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্পসংক্রান্ত নথি অনুযায়ী, নিরাপদ পানির সুযোগ বাড়ানো, স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এ উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য। প্রকল্পের মাধ্যমে নতুন স্থাপনা নির্মাণের পাশাপাশি বিদ্যমান পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন অবকাঠামো উন্নত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) পরবর্তী সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করার কথা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে বাংলাদেশ সচিবালয়ে এ সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।
যেসব অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা
প্রকল্পের আওতায় নিম্নআয়ের পরিবারের জন্য ৫৯ হাজার ৭৭৮টি স্বাস্থ্যসম্মত দুই গর্তবিশিষ্ট ল্যাট্রিন স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি ৪ হাজার ৩৯৪টি কমিউনিটিভিত্তিক পানি সরবরাহ ইউনিট, ২২ হাজার ১৭৬টি অগভীর নলকূপ এবং ৪ হাজার ৮২৯টি গভীর নলকূপ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া সাবমার্সিবল পাম্প ও জলাধারসহ ৫ হাজার ৩৯৯টি অগভীর নলকূপ এবং ১ হাজার ১১৩টি গভীর নলকূপ স্থাপন করা হবে। জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য নির্মাণ করা হবে ১২৫টি গণশৌচাগার। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণে ১ হাজার ৭৯৭টি ব্যবস্থা এবং ১ হাজার ৬৮টি রিংওয়েল স্থাপনেরও প্রস্তাব রয়েছে।
পানির বিকল্প উৎস বাড়াতে পুকুর পুনঃখনন এবং ১৬টি পন্ড স্যান্ড ফিল্টার নির্মাণের পরিকল্পনাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
খরা ও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর হ্রাস বড় চ্যালেঞ্জ
পরিকল্পনা কমিশনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বরাতে বাসস জানিয়েছে, বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান-২১০০-এ চিহ্নিত পানিসংকটপ্রবণ ছয়টি এলাকার মধ্যে বরেন্দ্র অঞ্চলের অবস্থান দ্বিতীয়।
শুষ্ক মৌসুমে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর উল্লেখযোগ্যভাবে নিচে নেমে যাওয়ায় উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় খাবার পানি ও সেচের পানি সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়ে। বর্ষাকালে পানির প্রাপ্যতা কিছুটা বাড়লেও অনেক এলাকায় সংকট অব্যাহত থাকে।
পরিকল্পনা কমিশনের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বরেন্দ্র অঞ্চলে মাত্র ৬৩ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ মৌলিক স্যানিটেশন সুবিধার আওতায় রয়েছে। পর্যাপ্ত স্যানিটেশন ব্যবস্থার অভাবে পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ার পাশাপাশি পরিবেশদূষণের আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে। এর প্রভাব মানুষের স্বাস্থ্য, কর্মক্ষমতা এবং সামগ্রিক আর্থসামাজিক উন্নয়নের ওপর পড়ছে।
বারবার খরা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কমে যাওয়া এবং নিরাপদ পানির সীমিত উৎস পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রভাবেও এসব সমস্যা বাড়ছে। এ কারণে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের সব উপজেলাকে প্রকল্পের আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।
চার অর্থবছরে ব্যয়ের পরিকল্পনা
প্রকল্পের জন্য চার অর্থবছরে পর্যায়ক্রমে অর্থ ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রস্তাবিত বরাদ্দের মধ্যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ২৯২ কোটি ৯৩ লাখ টাকা, ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ৩৫০ কোটি ৩৭ লাখ টাকা, ২০২৮-২৯ অর্থবছরে ৩৬৭ কোটি ৫৮ লাখ টাকা এবং ২০২৯-৩০ অর্থবছরে ১৯২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা ব্যয়ের কথা বলা হয়েছে।
২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভায় নির্ধারিত শর্ত ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ভিত্তিতে প্রকল্পটি অনুমোদনের সুপারিশ করা হয়।
পরিকল্পনা কমিশনের মতে, নিরাপদ পানি সরবরাহ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়নের মাধ্যমে আধুনিক ও নিরাপদ জনপদ গড়ে তোলার নির্বাচনী অঙ্গীকারের সঙ্গেও প্রকল্পটি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
একনেকের অনুমোদন প্রয়োজন
প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ৫০ কোটি টাকার বেশি হওয়ায় সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ, অনুমোদন ও সংশোধনবিষয়ক ২০২২ সালের জুনে জারি করা নির্দেশনা অনুযায়ী একনেকের অনুমোদন প্রয়োজন।
এ কারণে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে প্রকল্পটি বিবেচনা ও অনুমোদনের জন্য একনেকের সভায় উপস্থাপনের সুপারিশ করেছে পরিকল্পনা কমিশন।
প্রকল্পটি অনুমোদন ও যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে বরেন্দ্র অঞ্চলের পানিসংকট মোকাবিলা, স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন সুবিধা সম্প্রসারণ এবং জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নে ভূমিকা রাখার প্রত্যাশা করা হচ্ছে। তবে এর সুফল কতটা কার্যকরভাবে মানুষের কাছে পৌঁছাবে, তা নির্ভর করবে প্রকল্প বাস্তবায়ন, অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিরাপদ পানির উৎসগুলোর দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বের ওপর।
Comments