৭০ পৌরসভার উন্নয়নে ৩০০ কোটি টাকার প্রকল্প উঠছে একনেকে
দেশের আট বিভাগের ৭০টি পৌরসভায় স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নাগরিক সেবার মান বাড়াতে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রকল্পটির আওতায় পৌরসভার নিজস্ব রাজস্ব আদায় বাড়ানো, ডিজিটাল ওয়ানস্টপ সেবা ও ই-পেমেন্ট চালু এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
'প্রবৃদ্ধি: নির্বাচিত পৌরসভায় স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন' শীর্ষক প্রকল্পটি আগামীকাল রোববার (২৫ অক্টোবর) জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। প্রকল্পটির মোট প্রস্তাবিত ব্যয় ২৯৯ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারের অর্থায়ন ২৫৪ কোটি ৯৯ লাখ টাকা এবং সুইজারল্যান্ডের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা সুইস ডেভেলপমেন্ট করপোরেশনের (এসডিসি) অনুদান ৪৫ কোটি টাকা।
স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রস্তাবিত এ প্রকল্প ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০৩০ সালের মার্চ পর্যন্ত বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মূল লক্ষ্য নির্বাচিত পৌরসভাগুলোতে স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন কার্যক্রমকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া এবং সেবা প্রদান ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় সক্ষমতা বাড়ানো।
ডিজিটাল সেবা ও রাজস্ব আদায়ে গুরুত্ব
প্রকল্পের আওতায় ৭০টি পৌরসভায় স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন কাঠামো বাস্তবায়নে অনুদান দেওয়া হবে। পাশাপাশি পৌরসভার সেবাগুলো ডিজিটাল করা, ওয়ানস্টপ সার্ভিস সেন্টার চালু এবং ই-পেমেন্ট ব্যবস্থা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এসব ব্যবস্থা চালু হলে নাগরিক ও উদ্যোক্তাদের বিভিন্ন সেবা গ্রহণ সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে পৌরসভার নিজস্ব আয় বাড়ানো, ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ উন্নত করা এবং স্থানীয় অর্থনীতির সম্ভাবনাময় খাতগুলো চিহ্নিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পের ব্যয় বিভাজনে স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন কাঠামো বাস্তবায়নে ১৯৬ কোটি ৯১ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। পৌরসভার ডিজিটাল সেবা চালুর জন্য রাখা হয়েছে ৩০ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। এ ছাড়া জাতীয় স্থানীয় সরকার ইনস্টিটিউটের (এনআইএলজি) জন্য ২৮ কোটি টাকা, অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণে ২ কোটি ৯৫ লাখ টাকা এবং গবেষণায় ১৯ কোটি ৮২ লাখ টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
উদ্যোক্তা সহায়তা ও বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্য
স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা এবং ব্যবসায়ীদের সহায়তার মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেওয়া হবে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার উদ্যোগও থাকবে প্রকল্পে।
এ ছাড়া নারী, যুব ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং স্থানীয় পর্যায়ে টেকসই কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রথম পর্যায়ের অভিজ্ঞতায় বাড়ছে প্রকল্পের পরিধি
পরিকল্পনা কমিশনের নথি অনুযায়ী, 'প্রবৃদ্ধি: স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন' কর্মসূচির প্রথম পর্যায়ে নির্বাচিত সাতটি পৌরসভায় 'বাংলা এলইডি মডেল' বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। ওই কার্যক্রমে পৌরসভা, বেসরকারি খাত ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সমন্বিত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়।
প্রথম পর্যায়ের কার্যক্রমে প্রায় ৩৮ হাজার উদ্যোক্তা এবং ৫০ হাজার সেবাগ্রহীতা সরাসরি উপকৃত হয়েছেন বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এ সময় প্রায় ৪৯ হাজার ১১১টি নতুন কর্মদিবস সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় উদ্যোক্তাদের আয় প্রায় ১২ কোটি টাকা বেড়েছে এবং সংশ্লিষ্ট পৌরসভাগুলো অতিরিক্ত প্রায় ৮ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করতে সক্ষম হয়েছে।
এই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এবার প্রকল্পের আওতা সাতটি পৌরসভা থেকে বাড়িয়ে ৭০টিতে সম্প্রসারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতির বিকাশ, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং পৌরসভার আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধির কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
আট বিভাগের ৭০ পৌরসভা অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব
প্রকল্পের আওতায় দেশের আট বিভাগের নির্বাচিত 'ক', 'খ' ও 'গ' শ্রেণির ৭০টি পৌরসভাকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পৌরসভা নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, জনসংখ্যা, নাগরিক সেবার চাহিদা, দারিদ্র্য ও উন্নয়ন ঘাটতি এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা উন্নয়নের সুযোগ, নিজস্ব রাজস্ব বাড়ানোর সম্ভাবনা, ডিজিটাল সেবা ও ই-পেমেন্ট চালুর প্রস্তুতি, যোগাযোগব্যবস্থা, আঞ্চলিক অর্থনৈতিক গুরুত্ব এবং জলবায়ু ও ভৌগোলিক ঝুঁকিও মূল্যায়নের মানদণ্ড হিসেবে রাখা হয়েছে।
গত ১৪ জুন ২০২৬ তারিখে পরিকল্পনা কমিশনে অনুষ্ঠিত প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভার সিদ্ধান্তের আলোকে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব পুনর্গঠন করে পাঠানো হয়। পরবর্তী সময়ে প্রকল্পটি ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০৩০ সালের মার্চ পর্যন্ত বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানি ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য (ভারপ্রাপ্ত সচিব) কবির আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নির্বাচিত পৌরসভাগুলোতে স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন কাঠামো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে। পাশাপাশি রাজস্ব আদায় ও সেবাদানের সক্ষমতা বাড়বে এবং ডিজিটাল সেবা, উদ্যোক্তা সহায়তা ও বিনিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারিত হবে।
Comments