বৈরী সময়ে সম্প্রীতির ডাক
সারাদেশে শারদীয় দুর্গোৎসব চলছে। দেবী দুর্গা অশুভ শক্তির বিনাশ, শুভশক্তির জয় এবং মানবকল্যাণের প্রতীক। শারদীয় দুর্গোৎসব তাই শুধু একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, আনন্দ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক অনন্য প্রকাশ। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে যখন ধর্মীয় বিদ্বেষ, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও পারস্পরিক অবিশ্বাসের খবর আমাদের বিচলিত করে, তখন প্রশ্ন জাগে-আমাদের চিরায়ত সম্প্রীতির বন্ধন কি ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে? বৈরি সময়ে তাই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সম্প্রীতির ডাক, মানবতার আহ্বান।
দুর্গাপূজার মূল শিক্ষা হলো অশুভের বিরুদ্ধে শুভের জয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা এবং অসত্যের বিরুদ্ধে সত্যের সংগ্রাম। দেবী দুর্গার দশ হাত সম্মিলিত শক্তি ও ঐক্যের প্রতীক। এই প্রতীকী তাৎপর্য আমাদের শেখায়, অন্যায় ও অশুভ শক্তিকে প্রতিহত করতে হলে বিভেদ ভুলে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ধর্মের প্রকৃত উদ্দেশ্যও মানুষের কল্যাণ সাধন, হিংসা কিংবা বিদ্বেষ ছড়ানো নয়।
বাংলাদেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। এ দেশের মাটি, মানুষ, ভাষা ও লোকজ সংস্কৃতিতে হিন্দু-মুসলমান, বৌদ্ধ-খ্রিষ্টানসহ নানা ধর্মের মানুষের সম্মিলিত অবদান রয়েছে। ঈদ, দুর্গাপূজা, বুদ্ধপূর্ণিমা কিংবা বড়দিন—প্রতিটি উৎসবই মানুষের মধ্যে আনন্দ ও সৌহার্দ্য ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে। 'ধর্ম যার যার, উৎসব সবার'-এই বহুল প্রচলিত স্লোগান আমাদের সেই উদার মানসিকতারই পরিচয় বহন করে। তবে স্লোগানটি তখনই অর্থবহ হবে, যখন প্রত্যেক মানুষ নিজের ধর্ম পালনের পাশাপাশি অন্যের ধর্মীয় বিশ্বাস ও স্বাধীনতার প্রতি যথাযথ সম্মান দেখাবে।
দুঃখজনকভাবে, বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর হামলা, মন্দির ও প্রতিমা ভাঙচুর এবং ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে ভীতি সৃষ্টির ঘটনা আমাদের উদ্বিগ্ন করে। এসব ঘটনা কেবল ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের নিরাপত্তাবোধকেই নষ্ট করে না, বরং সমাজের পারস্পরিক আস্থা ও সম্প্রীতিকেও প্রশ্নের মুখে ফেলে। পূজা এলেই যদি কোনো পরিবারকে নিরাপত্তার উদ্বেগে দিন কাটাতে হয়, তবে উৎসবের আনন্দ পূর্ণতা পায় কীভাবে? যে দেশে প্রত্যেকে সমান নাগরিক অধিকার নিয়ে বসবাস করার কথা, সেখানে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কারও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
অবশ্য বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা দিয়ে একটি দেশের সব মানুষকে বিচার করাও সমীচীন নয়। এখনো বহু জায়গায় মুসলমান প্রতিবেশীরা পূজামণ্ডপ পাহারা দেন, অন্য ধর্মের মানুষের পাশে দাঁড়ান এবং আনন্দ ভাগ করে নেন। এই মানবিক উদ্যোগগুলোই প্রমাণ করে, বিদ্বেষের চেয়ে ভালোবাসার শক্তি অনেক বড়। তবে সম্প্রীতি রক্ষার দায়িত্ব শুধু সাধারণ মানুষের সদিচ্ছার ওপর ছেড়ে দিলে চলবে না। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, হামলার নিরপেক্ষ তদন্ত, অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা এবং গুজব ও উসকানিমূলক বক্তব্য প্রতিরোধে রাষ্ট্রকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।
একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভ্রান্তিকর তথ্য যাচাই না করে প্রচার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা কিংবা একটি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে অন্য সম্প্রদায়কে দাঁড় করানোর অপচেষ্টা সম্পর্কে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার, গণমাধ্যম ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে মানবিক মূল্যবোধ, সহনশীলতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের চর্চা বাড়াতে হবে।
আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের 'মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম, হিন্দু-মুসলমান' পঙ্ক্তি আজও আমাদের পথ দেখায়। আবার আবদুল করিমের 'আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম' গানটি মনে করিয়ে দেয়, পারস্পরিক ভালোবাসা ও মিলেমিশে থাকার স্মৃতি আমাদের সাংস্কৃতিক চেতনায় কত গভীরভাবে প্রোথিত। সেই সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনতে হলে অতীতের সম্প্রীতির কথা শুধু স্মরণ করলেই হবে না, বর্তমানেও তার চর্চা করতে হবে।
দুর্গোৎসবের আনন্দ তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন প্রতিটি মণ্ডপ থাকবে নিরাপদ, প্রতিটি মানুষ পালন করতে পারবে নিজ নিজ ধর্ম, আর কোনো পরিবারকে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে আতঙ্কে দিন কাটাতে হবে না। নতুন প্রজন্মের জন্য এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব, যেখানে মানুষের পরিচয় নির্ধারিত হবে তার মানবিক গুণে, ধর্মীয় পরিচয়ে বিভাজনের মাধ্যমে নয়।
বৈরি সময়ে সম্প্রীতির ডাক তাই নিছক আবেগের আহ্বান নয়; এটি ন্যায়বিচার, নিরাপত্তা, সমান অধিকার ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার। অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভশক্তির বিজয় ঘটুক মানুষের ঐক্য, ভালোবাসা ও সাহসের মধ্য দিয়ে। ধর্ম যার যার, অধিকার সবার-এই বিশ্বাসকে ধারণ করেই গড়ে উঠুক অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ।
Comments