ঝিরির জলে বন্ধুরা, নীরব সবুজে আমি
প্রকৃতির খুব কাছে গিয়ে কেউ কেউ উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে—আমাদের রুনার মতো! আবার কেউ কেউ প্রকৃতিকে উপভোগ করতে চায় একটু নীরবে, একটু দূর থেকে; যেন তার সৌন্দর্যের সবটুকু নির্যাস ধীরে ধীরে অনুভব করা যায়। আমি বোধহয় দ্বিতীয় দলের মানুষ।
তাই বন্ধুরা যখন গ্রামের মেঠোপথ ধরে বড়বিল ইকো ভ্যালিতে পৌঁছে ঝিরির জলে ধাপাধাপি আর জলকেলিতে মেতে উঠছিল, আমি তখন তাদের ছবি তুলছিলাম, ভিডিও করছিলাম। ঝিরির স্বচ্ছ জলের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েছিলাম ঠিকই, কিন্তু জলের খুব কাছে গিয়ে নিজে জলকেলিতে নামিনি। তাপমাত্রা একটু বেশি ছিল সেদিন। তবে বন্ধুদের আনন্দের মাঝেই বুঝতে পারছিলাম ঝিরির জলের শীতলতা।
আমি জলের খুব কাছে গিয়ে জলে নামি না— দূর থেকেই স্পর্শ করি, মনে মনে।
আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল মুরাদপুর জামানের সামনে থেকে। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী বন্ধুরা সেখানেই জমায়েত হওয়ার কথা। নোমান বলেছিল, সকাল ৯টার আগেই যেন পৌঁছাতে পারি। তাই ৭টা ৩০ মিনিটে রওনা দেওয়ার কথা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা তো পরিকল্পনার মতো চলে না! মনিকা এলো পৌনে ৮টায়, আর নোমান নিজেই এলো ৮টায়! হা হা... এমন কোনো প্রোগ্রাম কি আছে, যেখানে কেউ না কেউ একটু দেরি করবে না?
শেষ পর্যন্ত একটু দেরিতে হলেও পৌঁছে গেলাম বড়বিলে। এরপর প্রায় ৩০ মিনিটের হাঁটাপথ। মধ্য সকালের রোদে সেই পথটুকুও বেশ ভালো লেগেছিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, ফেরার সময় পথটাকে যেন আরও বেশি সুন্দর লাগছিল। ছায়ামাখা সন্ধ্যার নীরবতায় সবুজ যেন আরও গাঢ় হয়ে উঠেছিল। প্রকৃতির রঙ তখন অন্যরকম—শান্ত, গভীর, মায়াময়।
একেবারে খাঁটি গ্রাম্য পরিবেশ। চারপাশে জনমানবের কোলাহল নেই। মনে হচ্ছিল, এই সবুজের মালিকানার দাবি একাই আমি করতে পারি! কেউ এসে বাধা দেওয়ারও নেই। যদিও আমার কোনো বন্ধুই যে সেই দাবি করতে আসবে, এমনটা মনে হয়নি!
এরপর মাচায় বসে পান করা এক গ্লাস লেবুপানি—বেহেশতি অনুভূতির চেয়ে কোনো অংশে কম ছিল না। প্রকৃতির মাঝে, ক্লান্ত শরীরে, মাচার ওপর বসে ঠান্ডা লেবুপানি—সেই মুহূর্তটুকু আলাদাই।
কিছুক্ষণ পর নামল বৃষ্টি। মাত্র পাঁচ মিনিটের ঝুম বৃষ্টি। তারপর বৃষ্টি থামতেই বন্ধুরা সবাই নেমে পড়ল নিচু পাহাড়ি পথ পেরিয়ে ঝিরির জলে। তাদের সে কী আনন্দ!
ঝিরির পথ ধরে এগিয়ে গেছে সরু পাহাড়ি রাস্তা। দু'পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে চলে যাওয়া সেই পথটা ছিল অসাধারণ সুন্দর। সবুজের ভেতর দিয়ে আঁকাবাঁকা পথ, পাশে পাহাড়, নিচে ঝিরির জল—প্রকৃতি যেন নিজের হাতে সাজিয়ে রেখেছে পুরো দৃশ্যটা।
আমি অবশ্য তাদের সঙ্গে সেই পাহাড়ি পথ ধরে হাঁটার আনন্দটা মিস করেছি। কিন্তু সত্যি বলতে, কোনো আফসোস নেই।
কারণ সেই সময়টুকু আমি একা মাচায় বসে সবুজের সঙ্গে কাটিয়েছি। চারপাশের নীরবতা শুনেছি। বাতাসের শব্দ শুনেছি। সময়কে যেন কিছুক্ষণের জন্য ভুলে গিয়েছিলাম। প্রকৃতির সঙ্গ উপভোগ করতে হলে নীরবতা ভীষণ জরুরি।
তাই দু'পাহাড়ের সরু পথে হাঁটতে পারিনি বলে কোনো আক্ষেপ নেই। একান্ত ভালো লাগায় মাচাঘরটাতেই বসে কাটিয়ে দিয়েছিলাম অনেকটা সময়। সময় কতটা চলে গেল—তার হিসাবও করিনি তখন।
এরপর শুরু হলো খাওয়ার পর্ব। প্রতিটি রান্নায় ছিল একেবারে তাজা গ্রাম্য স্বাদ। সবাই পেটপুরে খেল। তারপর অলসভাবে শুয়ে-বসে কাটল আরও কিছুক্ষণ।
মাঝে বন্ধুরা কিছু সময় কার্ডও খেলে নিল। কোনো কিছু বাদ দিতে চায় না তারা, খাওয়া, আড্ডা, প্রকৃতি, কার্ড সবই চাই!
এরপর চা-পর্ব, ছবি-পর্ব সবশেষে আবার ফিরতি পথের যাত্রা।
এভাবেই কেটে গেল বন্ধুদের সঙ্গে অনেকদিন মনে রাখার মতো একটি দিন। বহু বহুদিন পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিলোসফির বন্ধুদের সঙ্গে এমন একটা দিন কাটালাম। আমাদের ৩৫তম ব্যাচেরই বন্ধু নোমানের ইকোভ্যালিতে।
অনুভূতি চমৎকার। খাওয়া বেশ ভালো। সবুজ প্রকৃতি—একেবারে ১০০ শতাংশ প্রাকৃতিক! শুধু চায়ের মানটা আরেকটু ভালো হলে মন্দ হতো না।
আর রাস্তা যদি মূল স্পটের আরও একটু কাছে নিয়ে যাওয়া যায়, তাহলে সাধারণ মানুষের জন্য জায়গাটিতে যাওয়া আরও সহজ হবে। নোমানের কথাবার্তা থেকে বুঝলাম, সেই কাজ হয়তো খুব বেশি দূরে নয়।
Comments