একদম তলানীতে বাংলাদেশের পর্যটন
আজ বিশ্ব পর্যটন দিবস। দিনটি এলেই বাংলাদেশে নানা আয়োজন হয়। পর্যটনসংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো দিবসটি ঘটা করে পালন করে, দেশের পর্যটন সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে। কিন্তু এসব আয়োজনের বাইরে বাস্তব চিত্রটি বেশ হতাশাজনক। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক স্থাপনা ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও পর্যটক আকর্ষণে বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে।
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ভ্রমণ ও পর্যটন প্রতিযোগিতা সূচকে ১৩৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২৯তম। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যেও বাংলাদেশের অবস্থান সর্বনিম্ন। একটি দেশের পর্যটন কতটা আকর্ষণীয় ও প্রতিযোগিতামূলক, তা নির্ধারণে নিরাপত্তা, অবকাঠামো, বিমান যোগাযোগ, আবাসন, পর্যটনসেবা, পরিবেশসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়। এসব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।
বিদেশি পর্যটক আকর্ষণের জন্য শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য থাকলেই হয় না; প্রয়োজন নিরাপদ পরিবেশ, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, মানসম্মত আবাসন, পরিচ্ছন্নতা, তথ্যসেবা এবং পর্যটকবান্ধব প্রশাসন। অথচ দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে সড়ক বা নদীপথে ভ্রমণ করলে একজন বিদেশি পর্যটককে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার মতো মানসম্মত ও পরিচ্ছন্ন পাবলিক টয়লেট পাওয়াও কঠিন। রাস্তা, বাজার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য মৌলিক সেবার চিত্রও অনেক ক্ষেত্রে একই রকম।
গবেষকদের বিশ্লেষণে বাংলাদেশের পর্যটন সমস্যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পাঁচটি বিষয়—নীতি ও তার বাস্তবায়নের ঘাটতি, প্রশাসন ও নিরাপত্তার দুর্বলতা, টেকসই অবকাঠামোর অভাব, পরিবেশ ও পরিচ্ছন্নতার সংকট এবং কৌশলগত বিপণন বা কান্ট্রি ব্র্যান্ডিংয়ের দুর্বলতা। অর্থাৎ সমস্যা শুধু অর্থের নয়; বড় সমস্যা নীতি, ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়নে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে পর্যটনের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। জাতিসংঘের বিশ্ব পর্যটন সংস্থার হিসাবে, বিশ্ব পর্যটন খাতের আয় ছিল ১১.৬ ট্রিলিয়ন ডলার এবং বিশ্ব জিডিপিতে এর অবদান ছিল ১১.৯ শতাংশ। বিপরীতে বাংলাদেশের জিডিপিতে পর্যটন খাতের অবদান ১ শতাংশেরও কম। ফলে বিশ্বের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক খাতের সম্ভাবনা থেকেও বাংলাদেশ কাঙ্ক্ষিত সুবিধা নিতে পারছে না।
আরেকটি বড় বৈপরীত্য হলো—বাংলাদেশের মানুষ বিদেশ ভ্রমণে আগ্রহী হলেও বিদেশিদের বাংলাদেশে আনার ক্ষেত্রে আমরা অনেকটাই উদাসীন। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি বিদেশে ভ্রমণ করেন, ফলে দেশের পর্যটন ব্যয়ের একটি বড় অংশ বিদেশে চলে যায়। বিপরীতে বাংলাদেশে বিদেশি পর্যটকের প্রবাহ তুলনামূলকভাবে খুবই কম। এর পেছনে অবকাঠামো ও নিরাপত্তার পাশাপাশি কূটনৈতিক উদ্যোগের ঘাটতিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বাংলাদেশের পাসপোর্টের তুলনামূলক দুর্বল অবস্থানও আন্তর্জাতিক পর্যটন ও ভ্রমণের ক্ষেত্রে একটি বাস্তব চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে বিদেশি পর্যটকদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়া, যোগাযোগ, তথ্যপ্রাপ্তি এবং পর্যটনসেবাকে আরও সহজ ও সমন্বিত করার প্রয়োজন রয়েছে।
বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের পর্যটনের পরিচিতি অনেকটাই কক্সবাজার, সুন্দরবন ও পার্বত্য চট্টগ্রামকেন্দ্রিক। অথচ দেশের পর্যটন সম্ভাবনা এর চেয়ে অনেক বিস্তৃত। পুঠিয়া, বাঘা, বরেন্দ্র অঞ্চল, শ্রীমঙ্গল, রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়িসহ অসংখ্য ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও প্রাকৃতিক গন্তব্যকে পরিকল্পিত পর্যটন সার্কিটের আওতায় আনা সম্ভব। কিন্তু এসব গন্তব্যে পর্যটন অবকাঠামো, নিরাপত্তা ও সেবার মান উন্নত না হলে আন্তর্জাতিক পর্যটকের কাছে এগুলোকে আকর্ষণীয় করে তোলা কঠিন।
তাই পর্যটনকে বিচ্ছিন্ন কোনো খাত হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি। সরকার পরিবর্তন হলেও যাতে পর্যটন নীতিতে বড় ধরনের ছেদ না পড়ে, সে জন্য প্রয়োজন নীতির ধারাবাহিকতা। জাতীয় পর্যটন মহাপরিকল্পনা দ্রুত চূড়ান্ত করে বাস্তবায়নে যেতে হবে। বিমান চলাচল, ভিসা, বিনিয়োগ, নিরাপত্তা ও পর্যটন ব্যবস্থাপনার মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে কার্যকর ক্ষমতাসম্ভরমী একটি কেন্দ্রীয় সমন্বয় কাঠামোও প্রয়োজন।
একই সঙ্গে কূটনীতিকদের পর্যটনকে বৈদেশিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। যেসব দেশ থেকে বাংলাদেশে পর্যটক আসার সম্ভাবনা বেশি, সেসব দেশে পরিকল্পিত প্রচারণা, সহজ ভিসা ব্যবস্থা এবং পর্যটনভিত্তিক কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করা প্রয়োজন।
পর্যটন উন্নয়নের জন্য সব সময় বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয় না। অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজন সঠিক নীতি, নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা, পর্যটকবান্ধব প্রশাসন, কার্যকর বিপণন এবং ধারাবাহিক বাস্তবায়ন। বাংলাদেশের প্রকৃতি ও বৈচিত্র্য আমাদের আছে; এখন প্রয়োজন সেই সম্ভাবনাকে একটি কার্যকর অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ দেওয়ার উদ্যোগ।
বিশ্ব পর্যটন দিবসের আনুষ্ঠানিক আয়োজন তাই শুধু বক্তৃতা ও আলোচনা সভায় সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব পরিবর্তনের সূচনা করার উপলক্ষ হওয়া উচিত। কারণ পর্যটনের সম্ভাবনা নিয়ে গর্ব করার চেয়ে সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে দেশি-বিদেশি পর্যটকের জন্য নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও আকর্ষণীয় বাংলাদেশ গড়ে তোলাই এখন বড় প্রয়োজন।
Comments