কাগজে-কলমে কমছে খেলাপি ঋণ: সাময়িক স্বস্তি নাকি দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি?
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ব্যাংকিং খাতকে বলা হয় লাইফলাইন বা রক্তসঞ্চালনকারী ধমনী। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে এই ধমনী অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে খেলাপি ঋণের এক বিশাল পাহাড়ে। সম্প্রতি প্রকাশিত তথ্যে দেখা গেছে, চলতি বছরের মার্চ শেষে ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে বিশাল অঙ্কের ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৩২.২৬ শতাংশ। এটি নিঃসন্দেহে একটি শঙ্কার চিত্র। তবে এই অন্ধকার চিত্রের মাঝেও একটি আপাত স্বস্তির খবর হলো,দেশের ২৪টি ব্যাংক তাদের খেলাপি ঋণ কমাতে সক্ষম হয়েছে। প্রথম দেখায় এটিকে ব্যাংকিং খাতের একটি বড় সাফল্য বলে মনে হতে পারে, কিন্তু এর পেছনের প্রকৃত কারণ এবং এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে গভীরভাবে ভাবার সময় এসেছে। প্রশ্ন উঠেছে-এই ঋণ কমে যাওয়া কি আসলেই আদায়,নাকি স্রেফ খাতা-কলমের হিসাবের কারসাজি?
'অংক মিলানোর' খেলা?
সাধারণত ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমে যাওয়ার কথা তখনই,যখন গ্রাহকরা নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করেন এবং ব্যাংক তার বকেয়া টাকা উদ্ধার করতে পারে। কিন্তু আমাদের বর্তমান ব্যাংকিং বাস্তবতায় ঘটেছে ভিন্ন ঘটনা। অভিজ্ঞ ব্যাংকার এবং আর্থিক খাতের বিশ্লেষকদের মতে, প্রকৃত ঋণ আদায়ের মাধ্যমে এই খেলাপি ঋণ কমেনি। বরং ঋণ 'পুনঃতফসিল' করার কারণেই মূলত খেলাপি ঋণের খাতা হালকা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি নতুন এবং অতি নমনীয় নির্দেশনার সুযোগ নিয়ে ব্যাংকগুলো এই হিসাব মিলিয়েছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, মাত্র ১ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট বা এককালীন জমা দিয়েই একজন খেলাপি গ্রাহক তার ঋণকে 'নিয়মিত' বা ভালো ঋণ হিসেবে দেখানোর সুযোগ পাচ্ছেন। ফলে যে ঋণটি গতকাল পর্যন্ত খেলাপি বা কুঋণ হিসেবে লাল কালিতে চিহ্নিত ছিল, আজ মাত্র ১ শতাংশ টাকা জমা পড়তেই তা ব্যাংকের লেজারে 'সবুজ' অর্থাৎ নিয়মিত হয়ে যাচ্ছে। একে অর্থনীতির ভাষায় বলা হয় 'লোন এভারগ্রীনিং' বা ঋণকে জোর করে বাঁচিয়ে রাখা। এর ফলে কাগজে-কলমে খেলাপি ঋণের হার ও পরিমাণ কমলেও, ব্যাংকের ভল্টে বা ক্যাশ বক্সে কিন্তু কোনো টাকা আসছে না। এটি আসলে এক ধরণের জোড়াতালি মাত্র।
সুবিধা বনাম ঝুঁকি: মুদ্রার দুই পিঠ
তবে এই নমনীয় নীতিমালার যে একেবারেই কোনো ইতিবাচক দিক নেই,তা কিন্তু নয়। মুদ্রার ওপিঠও আমাদের দেখতে হবে। বিগত কয়েক বছর ধরে বৈশ্বিক ও দেশীয় অর্থনীতি একাধিক বড় ধাক্কার মধ্য দিয়ে গেছে। করোনা মহামারীর ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই শুরু হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ,যার ফলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ও ডলার সংকট দেখা দেয়। এর সাথে যোগ হয়েছিল দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি।
এ রকম একটি চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতে অনেক সৎ এবং প্রকৃত ব্যবসায়ী চরম সংকটে পড়েছেন। তাদের ব্যবসা সংকুচিত হয়েছে, নগদ টাকার প্রবাহ কমে গেছে। এই ধরনের ক্ষতিগ্রস্ত কিন্তু সৎ ব্যবসায়ীদের আবার ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দিতে ১ শতাংশ ডাউন পেমেন্টের এই নীতিগত সহায়তা সত্যিই প্রশংসনীয়। এটি ব্যবসায়ীদের দেউলিয়া হওয়া থেকে বাঁচাচ্ছে এবং কর্মসংস্থান টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করছে।
কিন্তু এই সুবিধার আড়ালে যে ঝুঁকি লুকিয়ে আছে,তা অত্যন্ত ভয়াবহ। মাত্র ১ শতাংশ টাকা দিয়ে বিপুল অঙ্কের ঋণ নিয়মিত করার এই সুযোগ ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। ব্যাংক যদি শুধু খাতা-কলমে ঋণ নিয়মিত দেখায় কিন্তু আসল টাকা ফেরত না পায়, তবে নতুন করে ঋণ দেওয়ার মতো তহবিল ব্যাংকের কাছে থাকবে না। তাছাড়া, এই নীতি সৎ ঋণগ্রহীতাদের নিরুৎসাহিত করে। একজন গ্রাহক যখন দেখেন যে বছরের পর বছর টাকা ফেরত না দিয়েও মাত্র ১ শতাংশ দিয়ে পার পাওয়া যায়,তখন তার নিয়মিত কিস্তি দেওয়ার প্রবণতা কমে যায়। এটি ব্যাংকিং খাতে এক ধরণের 'মোরাল হ্যাজার্ড' বা নৈতিক স্খলন তৈরি করে।
সুশাসনের সংকট
দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ ও আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই এই ধরণের কৃত্রিম উপায়ে খেলাপি ঋণ কমানোর সংস্কৃতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন। তাদের মতে,এই ১ শতাংশ ডাউন পেমেন্টের সুবিধা নিয়ে সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছে 'ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিরা'। এরা এমন এক শ্রেণির প্রভাবশালী গ্রাহক,যাদের ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তারা নানা অজুহাতে ব্যাংকের টাকা আটকে রাখে এবং রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে বারবার ঋণ পুনঃতফসিল করে পার পেয়ে যায়।
অর্থনীতিবিদদের স্পষ্ট হুঁশিয়ারি-ব্যাংক খাতে যদি অবিলম্বে কঠোর সুশাসন নিশ্চিত করা না হয়,তবে এই পুনঃতফসিল করা বিশাল অঙ্কের ঋণ ভবিষ্যতে আবারও খেলাপিতে পরিণত হবে। তখন এই ঋণের বোঝা আরও বড় এবং আরও নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়বে। একটি অসুস্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থা নিয়ে কোনো দেশই টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে না। খেলাপি ঋণের এই দুষ্টচক্র ভাঙতে হলে নিয়মের শিথিলতা নয়,বরং আইনের কঠোর প্রয়োগ প্রয়োজন।
দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতার জন্য করণীয়
১ শতাংশ ডাউন পেমেন্টের বিশেষ সুযোগ সাময়িকভাবে খেলাপি ঋণের গ্রাফকে নিচের দিকে নামিয়ে এনে ব্যাংকগুলোকে হয়তো একটা কৃত্রিম স্বস্তি দিয়েছে। কিন্তু একে স্থায়ী সমাধান ভাবলে তা হবে আত্মঘাতী। ব্যাংক খাতের দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতা ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হলে আমাদের মূল সমস্যার শিকড়ে হাত দিতে হবে।
ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের চিহ্নিতকরণ:সবার আগে সৎ ব্যবসায়ী এবং ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের আলাদা করতে হবে। যারা ইচ্ছাকৃতভাবে টাকা দিচ্ছে না, তাদের জন্য সব ধরণের নমনীয়তা বন্ধ করতে হবে।
আইনের কঠোর প্রয়োগ: ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। তাদের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা,নতুন ব্যবসার লাইসেন্স না দেওয়া এবং সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার মতো দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন: কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে হবে।
ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতা: যেসব ব্যাংক কর্মকর্তা নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে নামে-বেনামে ঋণ অনুমোদন করেছেন,তাদেরও জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।
৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে ২৪টি ব্যাংকের এই ঋণ কমানোর পরিসংখ্যান একটি সাময়িক জোড়াতালি ছাড়া আর কিছুই নয়। ১ শতাংশ ডাউন পেমেন্টের মলম দিয়ে ক্যান্সারের মতো বড় ক্ষত নিরাময় সম্ভব নয়। ব্যাংক খাতের দীর্ঘমেয়াদি রোগ মুক্তি এবং দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে হলে ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে আপসহীন কঠোরতা এবং ব্যাংকিং সুশাসন নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। খাতা-কলমের হিসাবের চেয়ে ব্যাংকের সিন্দুকের প্রকৃত টাকাই অর্থনীতির আসল শক্তি-এই সত্যটি যত দ্রুত আমরা অনুধাবন করব, দেশের আর্থিক খাতের জন্য ততই মঙ্গল।
Comments