পরীক্ষায় নকলের নতুন হাতিয়ার ‘এআই চশমা’
পরীক্ষায় অসদুপায় বা নকল করার জন্য যুগে যুগে শিক্ষার্থীরা নানা কৌশল অবলম্বন করেছে—পকেটে চিরকুট রাখা থেকে শুরু করে হাতে লিখে আনা। তবে প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় এবার পরীক্ষার হলে প্রতারণার সবচেয়ে আধুনিক ও বিপজ্জনক মাধ্যম হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা 'এআই চশমা'।
বিশেষ করে পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে এই চশমা ব্যবহার করে নকল করার প্রবণতা আশঙ্কাজনকহারে বাড়ছে। গত ২৭ জুন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে এই নতুন উদ্বেগের চিত্র সামনে এসেছে।
এআই চশমা নিয়ে ধরা পড়ার কিছু সাম্প্রতিক ঘটনা:
দক্ষিণ কোরিয়া: সম্প্রতি দেশটিতে একটি ইংরেজি পরীক্ষা চলাকালীন দুই শিক্ষার্থীকে এআই চশমাসহ হাতেনাতে আটক করা হয়। দক্ষিণ কোরিয়ার ইতিহাসে এটিই প্রথম এআই চশমা দিয়ে জালিয়াতির ঘটনা।
তাইওয়ান: মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় এক পরীক্ষার্থী প্রশ্নপত্র হাতে পাওয়ার পর অদ্ভুতভাবে চশমা দিয়ে তাকাচ্ছিলেন। পরিদর্শকদের সন্দেহ হলে পরীক্ষা করে দেখা যায়, সচল থাকার কারণে চশমাটি থেকে অস্বাভাবিক তাপ বের হচ্ছিল।
চীন: এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত চীনের অত্যন্ত কঠিন ও মর্যাদাপূর্ণ 'গাওকাও' (বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা) পরীক্ষায় সব ধরনের চশমা স্ক্রিনিং করা বাধ্যতামূলক করা হয়। উল্লেখ্য, এই পরীক্ষায় এবার প্রায় এক কোটি শিক্ষার্থী অংশ নেয়।
কীভাবে কাজ করে এই 'স্মার্ট এআই চশমা'?
বিশ্ববাজারে মেটার 'রে-ব্যান স্মার্ট গ্লাসেস' (যা গত বছরই প্রায় ৭০ লাখ কপি বিক্রি হয়েছে) সহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের এআই চশমার জনপ্রিয়তা বাড়ছে। হংকং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মেং জিল্লি এক বছর ধরে বাজারে থাকা সাধারণ এআই চশমা নিয়ে একটি গবেষণা পরিচালনা করেন। তাঁর গবেষণায় চশমাটির কার্যপদ্ধতি যেভাবে উঠে এসেছে: শিক্ষার্থী যখন চশমা পরে প্রশ্নপত্রের দিকে তাকান, তখন চশমায় থাকা গোপন ক্যামেরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রশ্নটির ছবি বা টেক্সট রিড করে। ব্লুটুথ বা ইন্টারনেটের মাধ্যমে চশমাটি পরীক্ষার্থীর পকেটে থাকা স্মার্টফোনের সাথে যুক্ত থাকে। চশমার পাঠানো ডেটা ফোনের মাধ্যমে ইন্টারনেটে থাকা বড় এআই মডেলের (যেমন চ্যাটজিপিটি বা জেমিনি) কাছে চলে যায়। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে এআই মডেলটি নিখুঁত উত্তর তৈরি করে চশমার লেন্সে রিফ্লেক্ট বা প্রজেক্ট করে পাঠায় (যাকে বলে অগমেন্টেড রিয়েলিটি)। ফলে বাইরে থেকে কেউ না দেখলেও পরীক্ষার্থী লেন্সের ভেতরে উত্তরগুলো পরিষ্কার দেখতে পান।
অধ্যাপক মেং জিল্লি ১০০ জন শিক্ষার্থীর ওপর একটি মক (নকল) পরীক্ষা চালিয়েছিলেন। ফলাফলে দেখা যায়, যেসব শিক্ষার্থী এআই চশমা ব্যবহার করেছিলেন, তারা মেধা তালিকায় শীর্ষ ৫ জনের মধ্যে স্থান করে নেন।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এআই চশমা দিয়ে পরীক্ষার হলে জালিয়াতির ঘটনা মাত্র শুরু হয়েছে। এই চশমাগুলো দেখতে সাধারণ চশমার মতোই অত্যন্ত পাতলা ও হালকা হওয়ায় মেটাল ডিটেক্টরেও সহজে ধরা পড়ে না। ফলে আগামী দিনগুলোতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য প্রশ্নফাঁসের চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হতে যাচ্ছে এই অদৃশ্য এআই প্রযুক্তি।
Comments