একটি নান্দনিক মিলনমেলা: স্মৃতির আবেশে হৃদয়ের পুনর্মিলন
বিসিএস (নিরীক্ষা ও হিসাব) ক্যাডারের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের উদ্যোগে ২০ জুন, ২০২৬ ধানমন্ডির অভিজাত 'ফরেস্ট লাউঞ্জ'-এর দ্বাদশ তলার অনুষ্ঠিত হয়ে গেল এক জমকালো মিলনমেলা ও প্রীতিভোজ। এটি শুধু একটি আনুষ্ঠানিক সমাবেশ ছিল না; বরং ছিল দীর্ঘ কর্মজীবনের বন্ধন, আন্তরিকতা, ভালোবাসা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের এক অনন্য পুনর্মিলন। নান্দনিক এই মিলনমেলায় সুখকর অনুভূতি ও ভালোলাগার চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা একদা সরকারের উচ্চ পর্যায়ের প্রাক্তন কর্মকর্তারা।
এই মহতী আয়োজনের মূল উদ্যোক্তা, পরিকল্পনাকারী ছিলেন প্রাক্তন সিজিএ ফারুক মোহাম্মদ সিদ্দিকী। অবসরপ্রাপ্ত নিরীক্ষা ও হিসাব ক্যাডারের কর্মকর্তাদের হোয়াটসঅ্যাপ ফোরামে মিলনমেলার তার প্রস্তাবটি প্রথমেই অকুণ্ঠ সমর্থন করেন প্রাক্তন অর্থসচিব জাকির আহমদ খান। পরে সকল সদস্যের সর্বসম্মতিক্রমে 'যার যার ব্যয়, তার তার বহন' নীতিতে এই ব্যতিক্রমধর্মী অনুষ্ঠানের আয়োজনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
ফোরামের সিদ্ধান্ত মোতাবেক অনুষ্ঠান বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রাক্তন সচিব সফিকুল আজম, প্রাক্তন সিজিডিএফ ইকবাল হোসেন এবং প্রাক্তন অতিরিক্ত সচিব মো. মুর্শিদুল হক খানকে আয়োজক ফারুক মোহাম্মদ সিদ্দিকীকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করার দায়িত্ব প্রদান করা হয়। তাদের আন্তরিক প্রচেষ্টা, নিষ্ঠা ও সুষ্ঠু পরিকল্পনার ফলেই অনুষ্ঠানটি সর্বাঙ্গীণ সফলতা লাভ করে।
দীর্ঘদিন পর এই মিলনমেলায় ৭২ জন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এক হয়ে যেন ফিরে গিয়েছিলেন কর্মজীবনের সেই সোনালি দিনগুলোতে। একে অপরকে আলিঙ্গন, পুরোনো স্মৃতিচারণ, প্রাণখোলা হাসি, আন্তরিক কুশল বিনিময় এবং সহকর্মীদের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসায় পুরো অনুষ্ঠানস্থল হয়ে উঠেছিল আবেগময় ও প্রাণবন্ত।
অনুষ্ঠানের প্রতিটি পর্ব ছিল অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও নান্দনিক। স্বাগত বক্তব্য, স্মৃতিচারণ, সম্মিলিত আলোকচিত্র এবং মধ্যাহ্নভোজ—সবকিছুই ছিল পরিমিত, রুচিশীল ও আন্তরিকতার ছোঁয়ায় ভরপুর। অতিথি আপ্যায়ন, সুস্বাদু খাবার, সময়ানুবর্তিতা এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনা উপস্থিত সকলের প্রশংসা কুড়ায়।
আয়োজকদের আন্তরিক প্রচেষ্টা ও নিখুঁত পরিকল্পনার ফলে প্রতিটি অতিথি নিজেকে আপনজনের মাঝে খুঁজে পেয়েছেন। আপ্যায়ন, খাবারের মান, সময়ানুবর্তিতা এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনা ছিল অত্যন্ত সন্তোষজনক। পুরো আয়োজনজুড়ে অতিথিদের মুখে ছিল তৃপ্তির হাসি, আর মনে ছিল বহুদিন পর প্রিয় সহকর্মীদের কাছে পাওয়ার আনন্দ।
এই অনুষ্ঠানের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ছিল হারিয়ে যেতে বসা সম্পর্কগুলোকে নতুন করে জাগিয়ে তোলা। অনেকের ক্ষেত্রে এমনও হয়ছে যে সুদীর্ঘ ২০ বছর পর একের সাথে অপরের সাক্ষাৎ ঘটেছে। কর্মজীবনের অসংখ্য স্মৃতি, সুখ-দুঃখের গল্প এবং একসঙ্গে কাটানো সময় যেন আবারও সবার হৃদয়ে জীবন্ত হয়ে উঠেছিল। বিদায়ের ক্ষণে অনেকের চোখে আনন্দের সঙ্গে মিশে ছিল আবেগের অশ্রু, তবে সেই সঙ্গে ছিল আবারও এমন মিলনমেলায় একত্রিত হওয়ার দৃঢ় প্রত্যাশা। এ অনুষ্ঠান সম্পর্কে অনুষ্ঠান শেষে জনৈক সদস্য ফোরামে মন্তব্য করেন, 'বহুদিন পর ধানমন্ডির ফরেষ্ট লাউঞ্জে আয়োজিত ২০ জুনে আয়োজন কৃত অডিট সার্ভিসের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের গেট-টুগেদার ও মধ্যাহ্ন ভোজের এ আয়োজন সফল করে অনেক ত্যাগ স্বীকার করা ফারুক মোহাম্মদ সিদ্দিকী স্যার, আপনি স্বয়ং ও সফিকুল আজম স্যার ও অনুজ মূর্শিদুল হক প্রায় তিন সপ্তাহ নিরলসভাবে শ্রম দিয়েছেন- আপনাদের অডিট নাট্য মঞ্চের পেছনের কলাকুশলী বললে কম বলা হবে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত সকল কর্মকর্তার পক্ষ থেকে আপনাদের জন্য আন্তরিক অভিনন্দন, উষ্ণ ভালোবাসা এবং ভবিষ্যতে আপনাদের মাধমে আরও সুন্দর সুন্দর অনুষ্ঠানের প্রত্যাশা করি'।
ওয়াজির আহমেদ ফাতেহ অনুষ্ঠান পরিচালনায় ছিলেন। অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা অডিট সার্ভিসের গৌরবোজ্জ্বল অতীতের নানা ঘটনার স্মৃতিচারণ করে বক্তব্য দেন এবং তারা সবাই মিলনমেলাকে সাফল্যমন্ডিত করে তোলার জন্য ফারুক মোহাম্মদ সিদ্দিকী, শফিকুল আজম, ইকবাল হোসেন এবং মুর্শীদুল হক খানসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।
বক্তব্য দিতে গিয়ে জনাব শাহেদা খানম পুনর্মিলনীর অন্যতম সংগঠক আবু নোমান মো. হোসেন-এর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। জাকির আহমদ খান ভবিষ্যতে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য সফিকুল আজমকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন। বেগম জাকিয়া আক্তার চৌধুরীর প্রস্তাবে কমিটিতে একজন নারী সদস্য হিসেবে জনাব শাহেদা খানমকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ আয়োজনের জন্য একটি স্থায়ী তহবিল গঠনের লক্ষ্যে প্রারম্ভিক চাঁদা প্রদানের প্রস্তাবও সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।
অনুষ্ঠানে দেশের প্রশাসন, নিরীক্ষা ও হিসাব বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন প্রাক্তন অর্থসচিব, সচিব, সিএজি, সিজিএ, সিজিডিএফ, এনবিআর চেয়ারম্যান, রাষ্ট্রদূত এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাসহ বহু সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। তাঁদের উপস্থিতি অনুষ্ঠানটিকে আরও মর্যাদাপূর্ণ ও স্মরণীয় করে তোলে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মাহমুদ আলী খান- প্রাক্তন PAAS ও প্রাক্তন পরিচালক (অর্থ) বাংলাদেশ বিমান (যাঁর বর্তমান বয়স ৮৯ বছর), প্রাক্তন অর্থ সচিব জাকির আহমদ খান (বর্তমানে চেয়ারম্যান, পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন (PKSF)), জাকিয়া আকতার চৌধুরী, প্রাক্তন সচিব, প্রধান মন্ত্রীর কার্যালয়, সৈয়দ সাজেদুল করিম, প্রাক্তন সচিব ,ধর্ম মন্ত্রণালয়, ড. মোহাম্মদ আব্দুল মজিদ, প্রাক্তন চেয়্যারম্যান, এন বি আর ও সচিব ই আর ডি, জনাব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী, প্রাক্তন অর্থসচিব ও সিএন্ডএজি , সফিকুল আযম, প্রাক্তন সচিব, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, মামুনূর রশীদ চৌধুরী, ভারপ্রাপ্ত সচিব, কাজী সফিকূল আযম, প্রাক্তন সিনিয়র সচিব ইআরডি, নাজিম উদ্দিন চৌধুরী, প্রাক্তন সচিব, জ্বালানী মন্ত্রণালয়, মোহাম্মদ আসিফুজ্জামান, প্রাক্তন সচিব, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, শীষ হায়দার চৌধুরী সদ্য অবসরপ্রাপ্ত সচিব, আইসিটি মন্ত্রণালয়, শেখ মোতাহের হোসাইন, প্রাক্তন সচিব, মোহাম্মদ সাহজাহান, প্রাক্তন সচিব, মোশারফ হোসেন ভূঁইয়া প্রাক্তন সচিব ও চেয়ারম্যান, এন বি আর ও জার্মানীতে বাংলাদেশের প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত, শাহীন খান, প্রাক্তন সচিব, আবদূর রউফ, প্রাক্তন অতিরিক্ত সচিব, ফারুক মোহাম্মদ সিদ্দিকী, প্রাক্তন সিজিএ, রেজাউদ্দিন চৌধুরী প্রাক্তন সিজিএ, মো: মোতাহের হোসাইন, প্রাক্তন সিজিডিএফ, জনাব মো: মোসলেম উদ্দীন, প্রাক্তন সিজিএ, রণজিৎ চক্রবর্তী ,প্রাক্তন অতিরিক্ত সচিব, মোহাম্মদ আবুল কাশেম, প্রাক্তন সিজিএ, মো: জহুরুল ইসলাম, প্রাক্তন সিজিএ, কামরুন নাহার, প্রাক্তন সিজিএ এবং গ্রেড-২ ও গ্রেড- ৩ পর্যায়ের আরো অনেক অবসর প্রাপ্ত কর্মকর্তারা।
সব মিলিয়ে, বিসিএস (নিরীক্ষা ও হিসাব) ক্যাডারের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের এই মিলনমেলা ছিল সৌহার্দ্য, সম্মান, স্মৃতিচারণ ও মানবিক বন্ধনের এক অনন্য উৎসব। এটি প্রমাণ করেছে—সরকারি দায়িত্ব থেকে অবসর নেওয়া যায়, কিন্তু সহকর্মীদের প্রতি ভালোবাসা, আন্তরিকতা ও হৃদয়ের বন্ধন কখনো অবসরে যায় না। এমন মহৎ উদ্যোগ প্রতিবছর অব্যাহত থাকবে—এটাই সকলের আন্তরিক প্রত্যাশা।
Comments