চসিকে ১৭ কোটির ‘গোপন টেন্ডার’: অন্ধকারে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা!
কোটি টাকার যন্ত্রপাতি এসে পৌঁছেছে, বিল পাওয়ার দৌড়ে এগিয়ে ঠিকাদার, অথচ সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানেন না কিছুই!
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) এমন এক রোড রোলার ক্রয় প্রক্রিয়া নিয়ে উঠেছে বিস্ফোরক অভিযোগ, যেখানে টেন্ডার থেকে বিল সবকিছুই হয়েছে পর্দার আড়ালে। প্রায় ১৭ কোটি টাকার এই ক্রয়কে ঘিরে এখন প্রশ্ন একটাই নিয়ম কি কেবল কাগজেই, নাকি চসিক ভবনে নিয়ম-নীতির কোনো তোয়াক্কা নেই?
চসিক সূত্রে জানা যায়, টেন্ডার প্রক্রিয়া গোপন রেখে, প্রশাসনিক চেইন অব কমান্ড উপেক্ষা করে এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে অন্ধকারে রেখে ১০টি রোড রোলার ক্রয় ও বিল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। বিষয়টি নিয়ে প্রধান প্রকৌশলী ও মেয়রের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও দীর্ঘদিনেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় চসিকে নানা গুঞ্জন ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, চসিকের যান্ত্রিক উপবিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত এক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সম্প্রতি দামপাড়ার সিএনজি রিফিউলিং স্টেশন পরিদর্শনে গিয়ে সেখানে পাঁচটি নতুন ডাবল ড্রাম রোড রোলার দেখতে পান। একই সময়ে স্টেশনের সামনে ও প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির পেছনে আরও পাঁচটি নতুন থ্রি-হুইল রোড রোলার দেখতে পেয়ে তিনি বিস্মিত হন।
কারণ, যান্ত্রিক বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও এসব যন্ত্রপাতি ক্রয়, সরবরাহ বা বিল প্রক্রিয়া সম্পর্কে তার কাছে কোনো তথ্য ছিল না।
অভিযোগে বলা হয়েছে, বিষয়টি জানার জন্য যান্ত্রিক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী (যান্ত্রিক-১) এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কাছে জানতে চাওয়া হলেও তারা কোনো তথ্য দিতে পারেননি। এমনকি লিখিতভাবে তিন কর্মদিবসের মধ্যে বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চিঠির কোনো জবাব দেওয়া হয়নি।
এদিকে কেন্দ্রীয় স্টোরে খোঁজ নিয়ে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া যায় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় স্টোরে গিয়ে দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে সম্পূর্ণ পাশ কাটিয়ে যান্ত্রিক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ও তার অধীনস্থ টিম ঠিকাদারকে বিল দেওয়ার লক্ষ্যে স্টোরের প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন। অথচ চসিকের প্রচলিত বিধি অনুযায়ী এমন প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সম্পৃক্ততা বাধ্যতামূলক।
অভিযোগ অনুযায়ী, বিভিন্ন সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য পাঁচটি ডাবল ড্রাম রোড রোলার ক্রয়ে প্রায় সাত কোটি ৮৮ লাখ টাকার চুক্তি করা হয়। এ প্রকল্পের সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এম/এস সরকার কবির আহমেদ।
অন্যদিকে, পাঁচটি থ্রি-হুইল রোড রোলার ক্রয়ে প্রায় নয় কোটি সাত লাখ ৫০ হাজার টাকার আরেকটি চুক্তি করা হয়। এ প্রকল্পের সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সোহেল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন লিমিটেড।
তবে অভিযোগকারীর দাবি, এত বড় অঙ্কের দুটি ক্রয় প্রক্রিয়ায় তাকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রাখা হয়েছে। শুধু তাই নয়, কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশে বিধিবহির্ভূতভাবে বিল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
এ ঘটনায় চলতি বছরের মার্চ মাসে প্রধান প্রকৌশলীর কাছে লিখিতভাবে জানানো হলেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে মেয়রকেও বিষয়টি অবহিত করা হয়।
কিন্তু অভিযোগের পরও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে- চসিকের কোটি কোটি টাকার ক্রয় কার্যক্রমে আসলে কারা প্রভাব বিস্তার করছেন? কার স্বার্থে প্রশাসনিক নিয়মকানুন উপেক্ষা করা হচ্ছে?
এদিকে গুঞ্জন উঠেছে- নয় কোটি সাত লাখ ৫০ হাজার টাকায় কেনা পাঁচটি থ্রি-হুইল রোড রোলার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সোহেল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন লিমিটেড খোদ চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) কর্মকর্তার পছন্দের ঠিকাদার।
এ বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের এক নির্বাহী প্রকৌশলীর সাথে কথা হলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি জানান, দশটি রোড রোলার ক্রয়ের টেন্ডার প্রক্রিয়া চসিকের নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ ইমরান হোছাইন খোকা ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জসীম উদ্দিনের হাতেই সম্পন্ন হয়েছে।
তবে রোড রোলার ক্রয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে চসিকের নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ ইমরান হোছাইন খোকা জানান, এই দশটি রোড রোলার ক্রয় সম্পর্কে " সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো উন্নয়ন" প্রকল্পের পরিচালক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জসীম উদ্দিন ভালো বলতে পারবেন।
এদিকে টেন্ডার প্রক্রিয়া ও অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী মো. আনিসুর রহমান সোহেল ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জসীম উদ্দিনের মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের এক কর্মকর্তা জানান, এ ঘটনায় চসিকের আইন উপদেষ্টা মহিউদ্দিন মুরাদকে দায়িত্ব দিয়ে মেয়র মহোদয় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন।
তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে আইন উপদেষ্টা মহিউদ্দিন মুরাদের মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
Comments