সবার বাজেট, নাকি সবার নামে বাজেট?
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, এটি 'সব শ্রেণির মানুষের জন্য' প্রণীত বাজেট। সরকারের পক্ষ থেকে এমন দাবি নতুন নয়। প্রতিটি বাজেটের পরই অর্থমন্ত্রী বা সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা সাধারণত বাজেটের অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্রের কথা তুলে ধরেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রস্তাবিত ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট কি সত্যিই সব মানুষের স্বার্থকে সমানভাবে প্রতিফলিত করেছে? বাজেটের বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করলে সেই দাবির সঙ্গে বাস্তবতার একটি স্পষ্ট ফারাক চোখে পড়ে।
প্রথমেই আসা যাক করমুক্ত আয়ের সীমার বিষয়ে। সরকার ব্যক্তিগত করদাতাদের জন্য করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করেছে। কিন্তু বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই সীমা কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। দেশে দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। খাদ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব খাতেই মানুষের ব্যয় বেড়েছে। ফলে কয়েক বছর আগের তুলনায় একই আয় এখন অনেক কম ক্রয়ক্ষমতা বহন করে। এমন পরিস্থিতিতে করমুক্ত আয়ের সীমা অন্তত ৪ লাখ টাকা, এমনকি ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত উন্নীত করার দাবি অর্থনীতিবিদদের একটি অংশের মধ্যে ছিল। সরকার সেই পথে হাঁটেনি। ফলে সীমিত আয়ের চাকরিজীবী ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর করের চাপ কার্যত বহাল থাকছে।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, আবারও কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রাখা হয়েছে। অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালোটাকা আবাসন খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে বৈধ করার যে ব্যবস্থা অব্যাহত রাখা হয়েছে, তা করব্যবস্থার ন্যায়বিচারের ধারণাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। যারা নিয়মিত আয়কর প্রদান করেন, আইন মেনে চলেন এবং রাষ্ট্রের প্রতি তাদের আর্থিক দায়িত্ব পালন করেন, তাদের সঙ্গে যারা কর ফাঁকি দিয়ে সম্পদ গড়েছেন, তাদের একই কাতারে দাঁড় করানো কোনোভাবেই নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
কালো টাকা সাদা করার সুযোগ শুধু রাজস্ব নীতির বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থানেরও প্রশ্ন। বারবার এমন সুযোগ দেওয়া হলে একটি ভুল বার্তা সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়-সততার চেয়ে অনিয়মের লাভ বেশি। এতে কর সংস্কৃতি দুর্বল হয়, সৎ করদাতাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিক আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাজেটের সামষ্টিক অর্থনৈতিক ভিত্তি নিয়েও রয়েছে যথেষ্ট সংশয়। সরকার আগামী অর্থবছরের জন্য প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ, রপ্তানি, আমদানি, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ এবং রাজস্ব আহরণের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, তার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে চলতি অর্থবছরের বিভিন্ন প্রাক্কালন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সেই ভিত্তি কতটা বাস্তবসম্মত? যদি ভিত্তিগত হিসাবই দুর্বল হয়, তাহলে তার ওপর দাঁড়িয়ে তৈরি করা ভবিষ্যৎ লক্ষ্যমাত্রাগুলোও ঝুঁকির মুখে পড়ে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে নানা ধরনের চাপের মধ্যে রয়েছে। বেসরকারি বিনিয়োগ প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না, ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট রয়েছে, ঋণের সুদের হার তুলনামূলকভাবে বেশি এবং বৈদেশিক মুদ্রার বাজারও পুরোপুরি স্থিতিশীল নয়। এই বাস্তবতায় উচ্চ প্রবৃদ্ধি ও রাজস্ব আহরণের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা সহজ হলেও তা বাস্তবায়ন করা কঠিন। ফলে বাজেটের অনেক লক্ষ্যই কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
সরকারি ব্যয়ের কাঠামোও উদ্বেগের কারণ। প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বা ৬৬ শতাংশ পরিচালন ব্যয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ উন্নয়ন ব্যয়ের তুলনায় প্রশাসনিক ও চলতি ব্যয়ের অংশ অনেক বেশি। এটি সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। যখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকর, জবাবদিহিমূলক এবং আধুনিক করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা চলছে, তখন বাজেটে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের জন্য সুস্পষ্ট কোনো রোডম্যাপ বা অর্থবহ কর্মপরিকল্পনা দেখা যায় না।
রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রাও বাস্তবতার বিচারে বেশ উচ্চাভিলাষী। সরকার ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কিন্তু অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, রাজস্ব আদায়ে ধারাবাহিকভাবে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা সম্ভব হয়নি। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বর্তমান গতি, ব্যবসায়িক পরিবেশের চ্যালেঞ্জ এবং কর প্রশাসনের সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় নিলে এই লক্ষ্য অর্জন অত্যন্ত কঠিন বলেই মনে হয়। রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হলে সরকারকে হয় ঋণের ওপর বেশি নির্ভর করতে হবে, নয়তো উন্নয়ন ব্যয়ে কাটছাঁট করতে হবে।
সবশেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মূল্যস্ফীতি। বর্তমানে মূল্যস্ফীতির হার প্রায় সাড়ে ৯ শতাংশের কাছাকাছি। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য অস্থির, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বিশ্ব সরবরাহ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করছে এবং আমদানিনির্ভর অর্থনীতির ওপর এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে। এই অবস্থায় আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। লক্ষ্যটি ইতিবাচক হলেও তা অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় নীতিগত পদক্ষেপের স্পষ্টতা বাজেটে অনুপস্থিত।
বাস্তবতা হলো, শুধু কর ছাড় দেওয়া বা কিছু পণ্যে শুল্ক কমানোর মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। প্রয়োজন বাজার ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, সরবরাহ চেইনের দক্ষতা বৃদ্ধি, মজুতদারি ও কারসাজির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা, জ্বালানি মূল্যের স্থিতিশীলতা এবং আর্থিক ও মুদ্রানীতির মধ্যে সমন্বিত পদক্ষেপ। এসব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি ছাড়া মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।
সর্বোপরি, এই বাজেটে কিছু ইতিবাচক দিক থাকলেও এটিকে নিঃসন্দেহে 'সব মানুষের বাজেট' বলা কঠিন। নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের স্বস্তির জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ সীমিত, কালো টাকা সাদা করার সুযোগ নৈতিক প্রশ্ন তৈরি করেছে, সামষ্টিক অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল এবং মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় কার্যকর কৌশলের ঘাটতি রয়েছে। তাই এই বাজেটকে সবার বাজেট বলার আগে একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন-এটি কি সত্যিই সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার চাপ কমাবে, নাকি কেবল একটি আশাবাদী ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে?
Comments