বড় বাজেট, ছোট রাজস্ব ভিত্তি: সামনে কোন অর্থনীতি?
অস্থির বিশ্ব বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার দায়িত্ব নেওয়া বিএনপি সরকারের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে নতুন অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট প্রস্তাব করেছে। প্রস্তাবিত এই ব্যয় বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের (৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা) চেয়ে ১৯ শতাংশ বেশি। টাকার ওই অংক বাংলাদেশের মোট জিডিপির ১৩.৭৩ শতাংশের সমান। বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদের দেওয়া বাজেটের আকার ছিল ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আওয়ামী লীগ সরকারের সংশোধিত বাজেটের ৬.১৮ শতাংশ বেশি এবং জিডিপির ১২.৬৫ শতাংশের সমান।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বৃহস্পতিবার বিকালে জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। তার আগে মন্ত্রিসভা ওই প্রস্তাব অনুমোদন করে।
জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তব্যের শুরুতেই অর্থমন্ত্রী বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের শাসনামল এবং জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাস্তবতার চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং দেশের অমিত সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে বাজেটকে একটি কৌশলগত নীতিপত্র হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
উন্নয়ন ব্যয়ে জোর,পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা
প্রস্তাবিত বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাবদ ৩ লাখ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সব মিলিয়ে মোট উন্নয়ন ব্যয়ের পরিমাণ ধরা হয়েছে ৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা। অন্যদিকে পরিচালন ব্যয়সহ অন্যান্য খাতে বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে ৬ লাখ ২১ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, মোট ব্যয়ের মধ্যে উন্নয়ন ব্যয়ের অংশ চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের ২৭.২৭ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩৩.৭০ শতাংশে উন্নীত করা হবে। একই সঙ্গে পরিচালন ব্যয়ের অংশ ৭২.৭৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬৬.৩০ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রীর ভাষায়, সরকারি ব্যয়ের কাঠামোয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়ার লক্ষ্যে এই পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
রাজস্বে উচ্চ লক্ষ্য, বাস্তবতা কঠিন
আগামী অর্থবছরের জন্য সরকারের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ১০.২ শতাংশ। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য উৎস থেকে ৯১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এই লক্ষ্য অর্জন কতটা সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ বাংলাদেশের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত কোনো অর্থবছরেই সরকার রাজস্ব আহরণের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে রাজস্ব আদায় হয়েছে প্রায় ৩ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা, যেখানে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। ফলে টানা দশম বছরের মতো রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন না হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ঘাটতি বাজেট ও ঋণনির্ভর অর্থায়ন
প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ঘাটতির পরিমাণ ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩.৬ শতাংশ। এই ঘাটতি পূরণে সরকার দেশি ও বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নেবে। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নেওয়া হবে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা, সঞ্চয়পত্র থেকে ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং অন্যান্য উৎস থেকে ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। অন্যদিকে বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ নেওয়া হবে প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ বাজেট বাস্তবায়নের বড় অংশই নির্ভর করছে ঋণের ওপর।
এই ঋণনির্ভরতা ভবিষ্যতে আরও বড় চাপ তৈরি করতে পারে। অর্থমন্ত্রী নিজেই জানিয়েছেন, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে সুদ পরিশোধে ব্যয় ছিল ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা ১৩ গুণের বেশি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকায়। চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসেই অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
কল্যাণমুখী কর্মসূচির বিস্তার
প্রস্তাবিত বাজেটের অন্যতম আলোচিত দিক হলো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণ। নতুন করে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড কর্মসূচি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির জন্য ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং কৃষক কার্ড কর্মসূচির জন্য ১ হাজার ৬২ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যমান সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় উপকার ভোগীর সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। ভর্তুকি ও প্রণোদনা বাবদ বরাদ্দ ধরা হয়েছে ১ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বিদ্যুৎ ও সার খাতে ভর্তুকির সম্ভাব্য পরিমাণ ৬৪ হাজার কোটি টাকা। সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির জন্য অতিরিক্ত ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার কথাও আলোচনায় রয়েছে।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক খাতে অগ্রাধিকার
প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক অবকাঠামো খাতে ২ লাখ ৭৯ হাজার ১ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা মোট বাজেটের ২৯.৭৪ শতাংশ। ভৌত অবকাঠামো খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ৭৪ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ১৮.৬৬ শতাংশ। এছাড়া সাধারণ সেবা খাতে ২ লাখ ৪৫ হাজার ১১৭ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকার দাবি করছে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান, গবেষণা, প্রযুক্তি এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়ার মাধ্যমে নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের প্রতিফলন ঘটেছে এই বাজেটে।
বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ
বাজেটে জিডিপির ৩১.৪ শতাংশ বিনিয়োগের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে বেসরকারি খাতে ২৪.৯ শতাংশ এবং সরকারি খাতে ৬.৫ শতাংশ বিনিয়োগের লক্ষ্য রয়েছে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি আশাব্যঞ্জক নয়। বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৪.৭৫ শতাংশে, যা দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। অন্যদিকে সরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৩০.৩৭ শতাংশে পৌঁছেছে। ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দাভাবের কারণে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির হারও কমে গেছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে বাংলাদেশের শ্রমবাজারে ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণ প্রবেশ করলেও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে মাত্র ৮৭ লাখের। অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক তরুণ কর্মসংস্থানের সুযোগ পাননি। শিল্প খাতেও সংকট স্পষ্ট। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের ৭৯টি কারখানায় ৭ হাজার ৭৮৪ শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছেন। শুধুমাত্র আল-মুসলিম গ্রুপেই ১ হাজার ৮৬৮ শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন।
রপ্তানি ও উৎপাদনে চাপ
বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস রপ্তানি খাতও বর্তমানে চাপে রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে মোট রপ্তানি আয় আগের বছরের তুলনায় ১.৫ শতাংশ কমে ৩৫.৫৭ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি আয় প্রায় ২ শতাংশ কমে ৩২.৬৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে আমদানি ৬.২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৫৪.৮০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও শিল্পের কাঁচামাল, মধ্যবর্তী পণ্য ও মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির প্রবণতা কমেছে। এর প্রভাব উৎপাদনেও পড়েছে। ফেব্রুয়ারিতে শিল্প উৎপাদন সূচক আগের বছরের তুলনায় ৩ শতাংশের বেশি কমেছে।
পুঁজিবাজারও দীর্ঘদিন ধরে স্থবির। দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে আইপিওর মাধ্যমে শিল্প খাতে নতুন অর্থায়ন আসছে না।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে বাড়তি বরাদ্দ
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১৭ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ১৬ হাজার ৯৫২ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রায় ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে।
ব্যাংকিং খাতে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি
অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, খেলাপি ঋণ কমানো, ঋণ অনুমোদন ও পুনঃতফসিল ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং ব্যাংক পরিচালনায় জবাবদিহিতা বাড়ানো হবে। দুর্বল ব্যাংকগুলোর জন্য ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা চালু এবং প্রয়োজন হলে পুনঃমূলধনীকরণ ও ব্যবস্থাপনা সংস্কারের পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
বাজেটের আসল পরীক্ষা বাস্তবায়নে
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট নিঃসন্দেহে একটি উচ্চাভিলাষী ও কল্যাণমুখী বাজেট। উন্নয়ন ব্যয় বৃদ্ধি, সামাজিক নিরাপত্তা সম্প্রসারণ, কৃষক ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য নতুন কর্মসূচি এবং ব্যাংকিং খাতে সংস্কারের উদ্যোগ ইতিবাচক বার্তা দেয়।
তবে বাজেটের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন দুটি-রাজস্ব আহরণ এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতা। জিডিপির তুলনায় রাজস্ব আদায়ের হার এখনও ৭ শতাংশের নিচে। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা, অপচয় ও দুর্নীতির অভিযোগও দীর্ঘদিনের। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বরাদ্দ বৃদ্ধি পেলেও প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে সেই সুবিধা পৌঁছানো নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
কেবল বাজেটের আকার বাড়ালেই উন্নয়ন নিশ্চিত হয় না। রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার, ব্যয়ের গুণগত মান বৃদ্ধি, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমেই এই বাজেটের সাফল্য নির্ধারিত হবে। অন্যথায় উচ্চাভিলাষী এই বাজেটও ঋণ, সুদ ও বাস্তবায়ন সংকটের চক্রে আটকে যাওয়ার ঝুঁকি থেকে মুক্ত থাকতে পারবে না।
Comments