আর্থিক খাতের বড় সমস্যা হয়ে উঠতে পারে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান জানিয়েছেন,আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংকটে পড়া পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে গঠিত 'সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক'-এর কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এটা চাইবে। কিন্তু এই ব্যাংকটি যে তারেক রহমান সরকারের জন্য আর্থিক খাতে বড় মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে, সেটাও ভাবনার বিষয়।
দেশের ব্যাংকিং খাতে নতুন সংযোজন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি। অনুমোদিত মূলধন ৪০ হাজার কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করে যাত্রা শুরু করা এই ব্যাংককে ঘিরে সরকার আশাবাদী। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে -এটি কি টেকসই আর্থিক সমাধান, নাকি সমস্যাগ্রস্ত খাতকে সাময়িকভাবে ঢেকে রাখার আরেকটি উদ্যোগ?
সরকারি অর্থায়ন: আস্থা নাকি নির্ভরতার ঝুঁকি?
৪০ হাজার কোটি টাকা অনুমোদিত মূলধনের মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা এসেছে সরাসরি সরকারের তহবিল থেকে। একদিকে এটি সরকারের শক্ত সমর্থনের বার্তা দেয়। অন্যদিকে,এটি একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করে-একটি বাণিজ্যিক ব্যাংক যদি শুরুতেই এত বড় পরিমাণ সরকারি অর্থের ওপর নির্ভরশীল হয়,তবে সেটি কতটা প্রতিযোগিতামূলক হতে পারবে?
সরকারি অর্থায়ন ব্যাংকটিকে প্রাথমিকভাবে স্থিতিশীলতা দিলেও,দীর্ঘমেয়াদে এটি করদাতাদের অর্থের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ব্যাংকটি যদি কাঙ্ক্ষিত ফল না দেয়,তাহলে ক্ষতির বোঝা শেষ পর্যন্ত জনগণের ওপরই বর্তাবে।
আমানতকে শেয়ারে রূপান্তর: কৌশল নাকি চাপ?
বাকি ২০ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা করা হয়েছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী ও প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকে শেয়ারে রূপান্তরের মাধ্যমে। এই পদক্ষেপটি তাত্ত্বিকভাবে ব্যাংকের মূলধন বাড়ায় এবং দায় কমায়। তবে সমালোচকরা বলছেন-সংশ্লিষ্ট আমানতকারীরা কি স্বেচ্ছায় শেয়ার নিচ্ছেন,নাকি এটি একটি চাপসৃষ্ট সিদ্ধান্ত? আমানত থেকে শেয়ারে রূপান্তর মানে ঝুঁকির মাত্রা বেড়ে যাওয়া। কারণ আমানত নির্দিষ্ট দায়,কিন্তু শেয়ার বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ। তাই এক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও সম্মতির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মূলধনের আকার বনাম ব্যবস্থাপনার দক্ষতা
৪০ হাজার কোটি টাকা অনুমোদিত মূলধন নিঃসন্দেহে বড় অঙ্ক। কিন্তু ইতিহাস বলছে, শুধু বড় মূলধন থাকলেই সফল ব্যাংক হওয়া যায় না। ব্যাংকিং খাতে সুশাসন,ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা,ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিচালনাই আসল শক্তি। যদি ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা থাকে, তাহলে বড় মূলধনও দ্রুত ঝুঁকিতে পড়ে যেতে পারে। অতীতে দেশের কিছু ব্যাংকের অভিজ্ঞতা সে কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।
ইসলামী ব্যাংকিং কাঠামো: বাস্তবায়ন কতটা কার্যকর?
দেশে একটি বড় ইসলামি ব্যাংক আছে। তাই ইসলামি নামটি সংশয় তৈরি করে। সম্মিলিত শরিয়া ব্যাংক রাখলেও পার্থক্য স্পষ্ট হতো। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং অনুসরণ করবে। ইসলামী ব্যাংকিংয়ের নীতি সুদমুক্ত লেনদেন ও মুনাফাভিত্তিক অংশীদারিত্ব, তাত্ত্বিকভাবে ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতির কথা বলে। কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় ইসলামী ব্যাংকিং কাঠামোতে নামমাত্র পরিবর্তন এনে প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের মতো কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ ওঠে।
তাই এখানে প্রশ্ন হলো- শরিয়াহ বোর্ড কতটা স্বাধীন থাকবে? তদারকি কতটা শক্তিশালী হবে? বিনিয়োগ কতটা প্রকৃত ইসলামী নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে?
অর্থনীতিতে প্রভাব
সরকারি বিনিয়োগের ফলে ব্যাংকটি বড় প্রকল্পে অর্থায়ন করতে পারবে-এটি ইতিবাচক দিক। তবে একই সঙ্গে এটি বাজারে প্রতিযোগিতার ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। সরকারি সহায়তা পাওয়া একটি ব্যাংক বেসরকারি ব্যাংকের তুলনায় অতিরিক্ত সুবিধা পেতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে বাজার কাঠামোকে প্রভাবিত করবে। এছাড়া,যদি এই উদ্যোগ মূলত দুর্বল বা সমস্যাগ্রস্ত সম্পদকে একত্র করে নতুন কাঠামোতে স্থানান্তরের কৌশল হয়,তাহলে তা কেবল সমস্যার রূপ বদলাবে -সমাধান নয়।
মূল প্রশ্ন
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি কি সত্যিই নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে,নাকি এটি ব্যাংকিং খাতের বিদ্যমান সংকটের সাময়িক পুনর্বিন্যাস?
এর সাফল্য নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ের ওপর-
১. স্বচ্ছতা
২. সুশাসন
৩. রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিচালনা
যদি এই তিনটি নিশ্চিত করা যায়,তবে এটি অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক শক্তি হতে পারে। অন্যথায়, বড় অঙ্কের মূলধনও আস্থাহীনতার ভারে নুইয়ে পড়তে পারে।
শেষ কথা
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি নিঃসন্দেহে একটি বড় আর্থিক উদ্যোগ। তবে বড় উদ্যোগ মানেই বড় সাফল্য নয়। এটি এখনো একটি সম্ভাবনা-সাফল্য বা ব্যর্থতা নির্ধারণ করবে এর পরিচালনা,নীতি ও জবাবদিহিতা। দেশের জনগণের অর্থ জড়িত থাকায়,এই ব্যাংকের প্রতিটি পদক্ষেপের ওপর স্বচ্ছ নজরদারি এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।
Comments