সিংহ ও চিতা বাঘের সাথে হাঁটাহাঁটি
জিম্বাবুয়ে নামক বিচিত্র দেশটিতে দর্শনীয় তালিকার এক নম্বরে আছেন স্বয়ং প্রেসিডেন্ট। লোকজন দূরদূরান্ত থেকে হাজারে হাজারে মিছিল করে আসে তাকে দেখার জন্য। এক অনুষ্ঠানে তিনি প্রধান অতিথি, ৪-৫ ঘণ্টা সবাইকে বসিয়ে রেখে তিনি এলেন। আমরা শ-দেড়েক বিদেশি অশেষ ভদ্রতায় উসখুশ করছি, জাগ্রত জনতা নেচে-গেয়ে হাসি-তামাশা করে সময় পার করল।
দর্শনীয় তালিকার দুই নম্বরে ভিক্টোরিয়া ফলস, সে গল্প আরেক দিন।
তালিকার বাকি অংশের পুরোটাই প্রাণিজগৎ। যেদিকে যাই, ঘন জঙ্গল— সাফারি পার্ক বা গেম রিজার্ভ।
আমি অনেক দেশে সাফারি পার্কে জিপে চড়ে হাতি, গণ্ডার, বাঘ, হরিণ দেখেছি। কাছাকাছি যেতেই দেয় না। জিপ থেকে নামা পর্যন্ত বারণ।
কিন্তু জিম্বাবুয়ের মানুষ যেমন হাসিখুশি, পশুপাখি আর জন্তু-জানোয়ারও মনুষ্যবৎসল। জঙ্গলের মধ্যে হেঁটে যেতে কোনো হাতি, গণ্ডার, জলহস্তি, হরিণ, বানর, শূকর সামনে পড়ে গেলে মোটেও দাঁতমুখ খিঁচিয়ে তেড়ে আসবে না— মোবাইল ফোনে ছবি তুলতে চেষ্টা করলে, তারা দিব্যি হাসিমুখে পোজ দিয়ে দাঁড়িয়ে যাবে। বাঘ-সিংহ পর্যন্ত নিরীহমুখে গায়ে হাত বুলাতে দেবে, লেজ দিয়ে কান চুলকানোর চেষ্টা করলেও আপত্তি করবে না।
এ রকম এক জঙ্গলে গিয়েছি। সেখানে লায়ন ওয়াক, অর্থাৎ সিংহের সঙ্গে হাঁটা কর্মসূচি।
বনরক্ষী হাতে লাঠি ধরিয়ে দিয়ে বলল, 'সিংহের সামনে নিচু হবেন না। মানুষের উচ্চতা আর লাঠি দেখলে ওরা আপনাকে প্রভু ভাববে।'
সেই লাঠিসমেত প্রভুসুলভ ভাবভঙ্গি করে বনের গভীরে গিয়ে দেখি দুটো বিকট আকৃতির সিংহ শুয়ে রোদ পোহাচ্ছে।
আমি লাঠি উঁচিয়ে গরু-মহিষের রাখালদের মতো মুখ দিয়ে 'অ্যাই... হট-হট' জাতীয় শব্দ করতেই সিংহদুটো উঠে আমার সঙ্গে হাঁটতে শুরু করল। রীতিমতো গৃহপালিত।
সহস্র শতাব্দী আগে আমাদের পূর্বপুরুষদের যারা রাখাল ছিলেন— তারা তৃণভূমিতে গরু, ছাগল, মেষ, ভেড়া, উট চড়াতেন। আজ এআই-এর যুগে আমি এই আফ্রিকার জঙ্গলে নির্ভয়ে লাঠি হাতে সিংহ চড়িয়ে বেড়াচ্ছি, বিষয়টা অবিশ্বাস্য!
আমার সঙ্গীসাথীরা বিপুল উৎসাহে-উত্তেজনায় কেউ সিংহের গায়ে হাত বুলিয়ে, কেউ সিংহকে জড়িয়ে ধরে ছবি তুলল। সিংহরা নিয়মিত গোসল করে না এবং হ্যান্ড স্যানিটাইজার আনতে ভুলে গিয়েছি— এ রকম বাহানা দিয়ে আমি একটু দূরে দূরে থাকলাম। তা ছাড়া আমি সিংহ রাশি, রাজা-বাদশা পর্যায়ের ব্যক্তিত্ব, বনের রাজা সিংহের এহেন অবমাননা ঠিক না।
জানা গেল— হঠাৎ অনাথ হয়ে পড়া এসব সিংহশাবক উদ্ধার করে এনে প্রাপ্তবয়স্ক ও স্বাবলম্বী হলে সাভানার গভীর বনে অবমুক্ত করা হয়।
সিংহের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমরা গেলাম পাশের জঙ্গলে।
সেখানে চিতার রাজত্ব। পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুতগামী স্থলচর প্রাণী— ৩ সেকেন্ডের মধ্যে ১২০ কিলোমিটার গতি তুলে ছুটতে পারে।
বিকেলের রোদে যে চিতা দম্পতি বিশ্রাম নিচ্ছিল, তাদের কাছে গিয়ে বাকরুদ্ধ হওয়ার অবস্থা। পোষা কুকুরের গলায় দড়ি দিয়ে বেঁধে লোকজন যেভাবে হাঁটতে বের হয়, চিতা দম্পতির গলায় আক্ষরিক অর্থে সে রকম দড়ি। লোকজন দড়ি ধরে চিতা নিয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে, সেলফি তুলছে, কেউ কেউ কাতুকুতু পর্যন্ত দেওয়ার চেষ্টা করছে। এইসব দৃশ্য থেকে আমি পুরোটা সময় হতভম্ব ছিলাম দেখে সেলফি তুলতে মনে ছিল না, তাই চিতার সঙ্গে আমার ছবি নাই।
মেয়ে চিতার, যথারীতি, খুবই তিরিক্ষি মেজাজ। সে হাঁটলে ছেলে চিতা হাঁটে, সে থামলে ছেলে চিতা থামে। ছেলে চিতার এহেন তটস্থ পরিস্থিতি দেখে আমরা সকলে মাথা দুলিয়ে একমত হলাম, জঙ্গলেও শান্তি নাই।
Comments