লন্ডন থেকে স্কটল্যান্ড, বিলাসী এক ট্রেন ভ্রমণের গল্প....
প্রতিটি জার্নি মানুষের অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করে। নতুন কিছু শেখায়। জ্ঞানের পরিধি বাড়ায়। মানুষের চিন্তা ও পৃথিবীকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন আনে। আমার প্রতিটি ভ্রমণেও তাই শুধু গন্তব্য নয়, পথের অভিজ্ঞতাগুলোও আমার কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ থেকে স্কটল্যান্ড যাওয়ার এবারের ভ্রমণটি ছিল একটি স্পোর্টস ইভেন্ট কাভার করার অ্যাসাইনমেন্টের অংশ। গন্তব্য স্কটল্যান্ড। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে সরাসরি স্কটল্যান্ডের ফ্লাইট খুঁজতে গিয়ে দেখলাম, ভাড়া অনেক বেশি। প্রায় সব এয়ারলাইন্সেই একাধিক ট্রানজিট। দীর্ঘ বিমান ভ্রমণের পর আবার বিমান বদলানোর ঝামেলাও রয়েছে।
তাই সিদ্ধান্ত নিলাম, সরাসরি স্কটল্যান্ড নয়। আগে লন্ডন যাবো। এরপর লন্ডন থেকে ট্রেনে স্কটল্যান্ড।
হিসাব করে দেখলাম, এভাবে গেলে খরচও অনেকটা কমে আসবে। তবে তখনও কয়েকটি বিষয় নিয়ে নিশ্চিত ছিলাম না। লন্ডনে নেমে কীভাবে ট্রেন ধরবো, কোন ট্রেনের সময় আমার ফ্লাইটের সঙ্গে মিলবে, টিকিট পাওয়া যাবে কি না, সবকিছু নিয়েই কিছুটা অনিশ্চয়তা ছিল।
আর তখনও জানতাম না, এই সিদ্ধান্ত আমাকে এমন একটি ট্রেনযাত্রার সুযোগ করে দেবে, যা আমার ভ্রমণ জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে।
লন্ডনে থাকা আমার কাছের এক বান্ধবীর সঙ্গে পরিকল্পনাটি শেয়ার করলাম। যদি তার কাছে কোনো পরামর্শ থাকে। সে মাত্র এক মিনিট সময় নিলো। বললো, "তুমি ফোনটা রাখো। এখনই ব্যবস্থা করছি।"
জানালো, ইউকে রেলে তার একজন ভাই কাজ করেন। কিছুক্ষণ পর তার কাছ থেকে একটি ফোন নম্বর পেলাম। WhatsApp-এ যোগাযোগ করতে বললো। তিনি রিয়াদ ভাই। ইউকে রেলে কর্মরত একজন বাংলাদেশি। ফোন করতেই অত্যন্ত আন্তরিকভাবে সাড়া দিলেন। আমার ভ্রমণের শিডিউল জানতে চাইলেন। বললাম, আমরা দুইজন যাত্রী।
রিয়াদ ভাই বললেন, তিনি চেষ্টা করছেন। আমি ভেবেছিলাম, হয়তো কিছু তথ্য দেবেন বা কোথা থেকে টিকিট পাওয়া যায়, সে বিষয়ে পরামর্শ দেবেন। কিন্তু প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যেই WhatsApp-এ পাঠিয়ে দিলেন আমাদের ট্রেনের টিকিট।
লন্ডন থেকে স্কটল্যান্ডের মধ্যে চলাচলকারী বিখ্যাত Caledonian Sleeper-এর একটি Caledonian Double En-suite কেবিন। সত্যি বলতে, তখনও বুঝতে পারিনি আমাদের জন্য কী ধরনের অভিজ্ঞতা অপেক্ষা করছে।
রিয়াদ ভাই জানালেন, এই ট্রেনের টিকিট সাধারণত অনেক আগে থেকেই বিক্রি শুরু হয়। কর্মী কোটায় টিকিট পাওয়ার ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে। সাধারণত আবেদন করে অপেক্ষা করতে হয়। কিন্তু আমাদের জন্য তিনি দ্রুত ব্যবস্থা করে ফেলেছেন। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় ছিল, তিনি আমার কাছ থেকে কোনো টাকা নিলেন না। পরে অনলাইনে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, Caledonian Sleeper-এর ভাড়া যাত্রার তারিখ, বুকিংয়ের সময়, যাত্রীর সংখ্যা এবং কেবিনের ধরন অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়। আর Caledonian Double En-suite তাদের অন্যতম প্রিমিয়াম accommodation option। যারা টিকিটের মুল্য জনপ্রতি বাংলাদেশী টাকায় ১৮ হাজার টাকার কাছাকাছি।
যে যাত্রাটিকে শুরুতে শুধু সময় ও খরচ বাঁচানোর একটি উপায় হিসেবে দেখেছিলাম, সেটিই শেষ পর্যন্ত হয়ে গেল একটি বিশেষ অভিজ্ঞতা। নির্দিষ্ট দিনে পৌঁছে গেলাম লন্ডনের Euston Station-এ।
স্টেশনে পৌঁছে প্ল্যাটফর্ম খুঁজে পেতে কোনো সমস্যা হলো না। টিকিটেই প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া ছিল। আমাদের টিকিটের সঙ্গে Guest Lounge ব্যবহারের সুবিধাও ছিল। সেখানে চা, কফি, হালকা নাস্তা, Wi-Fi এবং গোসলের সুবিধাসহ যাত্রীদের জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা রয়েছে। তবে আমরা লাউঞ্জে না গিয়ে সরাসরি ট্রেনে ওঠার সিদ্ধান্ত নিলাম।
প্ল্যাটফর্মে কিছুদূর এগুতেই দেখলাম, কয়েকজন কর্মকর্তা ডেস্ক নিয়ে যাত্রীদের সহায়তা করছেন। তাদের কাছে মোবাইলে থাকা টিকিট দেখাতেই তারা তালিকা মিলিয়ে নিলেন। সেই তালিকায় নিজের নামটিও দেখতে পেলাম। এরপর হাতে পেলাম একটি Keycard।
হোটেলের রুমে ঢোকার জন্য যেমন কার্ড ব্যবহার করা হয়, অনেকটা তেমন। জানানো হলো, এই কার্ড দিয়েই আমাদের কোচ এবং নির্ধারিত কেবিনের দরজা খোলা যাবে।
কিছুদূর এগিয়ে খুঁজে পেলাম আমাদের কোচ।
তারপর নির্ধারিত কেবিন। কার্ডটি দরজায় স্পর্শ করতেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে দরজা খুলে গেল। ভেতরে ঢুকেই সত্যিই অবাক হলাম।
ছোট্ট জায়গার মধ্যে অত্যন্ত পরিপাটি একটি ডাবল বেড। পরিষ্কার সাদা বিছানা। সুন্দরভাবে সাজানো কেবিন। ব্যক্তিগত বাথরুম। শাওয়ার। আধুনিক টয়লেট্রিজ। চার্জিং পয়েন্ট। Wi-Fi। পানি, চাদর, তোয়ালে সবকিছু।
আমাদের কেবিনটি ছিল Caledonian Double En-suite। এটি Caledonian Sleeper-এর অন্যতম প্রিমিয়াম কেবিন। এতে একটি ডাবল বেডের পাশাপাশি ব্যক্তিগত en-suite shower room থাকে। কেবিনের টেবিলে ছিল মেনুবুক। আর ছিল একটি Breakfast Card।
সেখানে সকালে কী খাবো, কখন খাবো, কী ধরনের পানীয় চাই, সেগুলো বেছে নেওয়ার সুযোগ ছিল।
আমরা পছন্দের খাবার ও সময় নির্বাচন করে কার্ডটি দরজার বাইরে ঝুলিয়ে দিলাম।
সবকিছু শেষ করে কেবিনে বসতেই মনে হলো, এটি সাধারণ কোনো ট্রেন ভ্রমণ নয়। এটি যেন চলন্ত একটি ছোট্ট হোটেল কক্ষ। এক মিনিটও যেন দেরি হলো না। নির্ধারিত সময়েই ট্রেন যাত্রা শুরু করলো।
ঢাকা থেকে লন্ডন পর্যন্ত দীর্ঘ বিমান ভ্রমণের ক্লান্তি তখন শরীরে। তাই কেবিনে পোশাক পরিবর্তন করে ফ্রেশ হয়ে সাদা বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম। বাইরে তখন রাত। ট্রেন ছুটছে স্কটল্যান্ডের দিকে। আর আমরা ঘুমিয়ে পড়লাম।
ঘুমানোর আগে মোবাইলে অ্যালার্ম সেট করলাম। স্কটল্যান্ড পৌঁছানোর নির্ধারিত সময়ের প্রায় এক ঘণ্টা আগে ঘুম থেকে উঠবো। একই সঙ্গে সকাল সাড়ে ৬টার জন্য breakfast-এর সময়ও নির্ধারণ করে দিয়েছিলাম।অ্যালার্মে যখন ঘুম ভাঙলো, তখন ভোর ৬টা। ফ্রেশ হয়ে প্রস্তুত হলাম।
ঠিক সাড়ে ৬টায় breakfast চলে এলো আমাদের কেবিনে। সকালের খাবার শেষ করতে করতে ট্রেন ঢুকে পড়লো Glasgow Central Station-এ। এক রাত আগে লন্ডনের Euston Station থেকে যে ট্রেনে উঠেছিলাম, সেটিই আমাদের ঘুমের মধ্যে নিয়ে এসেছে স্কটল্যান্ডে। অনুভূতিটা ছিল সত্যিই অসাধারণ।
মনে হলো, পাঁচতারকা হোটেলের একটি আরামদায়ক কক্ষে ঘুমিয়েছি। সকালে ঘুম থেকে উঠে নাশতা করেছি। আর সেই ঘরটিই ধীরে ধীরে আমাকে নিয়ে এসেছে নতুন একটি দেশে, নতুন এক শহরে।
লন্ডন থেকে স্কটল্যান্ড। বিমান নয়। রাতের ট্রেন। ঘুমের মধ্যে শহর বদলে ফেলা।
এটাই Caledonian Sleeper-এর বিশেষত্ব।
Caledonian Sleeper মূলত London ও Scotland-এর মধ্যে চলাচলকারী একটি ঐতিহ্যবাহী overnight sleeper train service। London Euston থেকে Glasgow, Edinburgh, Aberdeen, Inverness এবং Fort Williamসহ স্কটল্যান্ডের বিভিন্ন গন্তব্যে রাতের ট্রেন চলাচল করে।
এই পরিষেবার ইতিহাসও দীর্ঘ। London ও Scotland-এর মধ্যে sleeper train service-এর ইতিহাস দেড়শ বছরেরও বেশি পুরোনো। ১৮৭৩ সালে Glasgow Queen Street থেকে London King's Cross পর্যন্ত sleeper service চালু হয়েছিল। ২০২৩ সালে Caledonian Sleeper তার ১৫০ বছর পূর্তি উদযাপন করেছে। আধুনিক কেবিন, sleeping accommodation, Club Car এবং private en-suite সুবিধার কারণে Caledonian Sleeper এখন শুধু একটি পরিবহন ব্যবস্থা নয়। এটি নিজেই একটি ভ্রমণ অভিজ্ঞতা।
এই ভ্রমণের দিকে ফিরে তাকালে মনে হয়, শুরুতে যে সিদ্ধান্তটি নিয়েছিলাম শুধু খরচ কমানোর জন্য, সেটিই শেষ পর্যন্ত আমাকে একটি নতুন অভিজ্ঞতা উপহার দিয়েছে।
তবে এই যাত্রার সবচেয়ে মূল্যবান অংশ শুধু ট্রেনটি নয়। মূল্যবান ছিল মানুষের আন্তরিকতা। একজন বন্ধুর এক মিনিটের উদ্যোগ। রিয়াদ ভাইয়ের বড় আন্তরিক সহযোগিতা। আর এমন একটি সুযোগ, যা আমি আগে থেকে পরিকল্পনাই করিনি।
ভ্রমণের পথে অনেক মানুষ আসে। কেউ কয়েক মিনিটের জন্য পাশে থাকে। কেউ কয়েক ঘণ্টা। আবার কেউ একটি ছোট সহযোগিতার মাধ্যমে পুরো ভ্রমণটাকেই স্মরণীয় করে দেয়। রিয়াদ ভাই আমার জন্য তেমনই একজন মানুষ।
তার আন্তরিক সহযোগিতা ছাড়া হয়তো লন্ডন থেকে স্কটল্যান্ড যাওয়ার এই বিশেষ অভিজ্ঞতাটি আমার হতো না।
একটি স্পোর্টস অ্যাসাইনমেন্টের প্রয়োজনে শুরু হওয়া একটি সাধারণ ভ্রমণ পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত আমাকে এনে দিল ব্রিটেনের ঐতিহ্যবাহী overnight sleeper train-এর একটি অসাধারণ অভিজ্ঞতা।
এই যাত্রা আমাকে আবারও মনে করিয়ে দিল, ভ্রমণ শুধু এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পৌঁছানোর নাম নয়। ভ্রমণ মানে অভিজ্ঞতা। ভ্রমণ মানে শেখা। ভ্রমণ মানে নতুন মানুষকে জানা। নতুন সংস্কৃতি দেখা। নতুন কিছু অনুভব করা। আর কখনও কখনও ভ্রমণের সবচেয়ে সুন্দর গল্পটি তৈরি হয় গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই।
একটি স্মৃতি, যা হয়তো অনেক বছর পরও মনে থাকবে। কারণ সেদিন শুধু লন্ডন থেকে স্কটল্যান্ড যাইনি। ঘুমের মধ্যে একটি নতুন অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে হেঁটে গিয়েছিলাম।
Comments