ইসলামী ব্যাংকে আস্থার সংকট, নেতৃত্বহীনতা ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ
একসময় দেশের অন্যতম শক্তিশালী ও আস্থার প্রতীক হিসেবে পরিচিত ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ এখন গভীর আর্থিক সংকটের মুখে। ব্যাংকটির সাম্প্রতিক আর্থিক প্রতিবেদন শুধু লোকসানের চিত্রই তুলে ধরছে না, বরং দেশের ব্যাংকিং খাতের সুশাসন, ব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়েও গুরুতর প্রশ্ন সামনে এনেছে।
চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) ব্যাংকটি কর-পরবর্তী নিট লোকসান করেছে ৩ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা। অথচ আগের বছরের একই সময়ে ব্যাংকটির মুনাফা ছিল প্রায় ৭৯ কোটি টাকা। আরও উদ্বেগজনক হলো, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ব্যাংকটির লোকসান দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯৭৬ কোটি টাকা। এই বিপুল লোকসানের প্রভাব পড়েছে শেয়ারপ্রতি আয়েও। প্রথম ৯ মাসে একক হিসাবে শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ২০ টাকা ৫১ পয়সা। সমন্বিত হিসাবে লোকসান ২০ টাকা ৪১ পয়সা।
ব্যাংকটির পক্ষ থেকে লোকসানের কারণ হিসেবে বিনিয়োগ থেকে কাঙ্ক্ষিত আয় না হওয়ার কথা জানানো হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বিনিয়োগ থেকে আয় কমে যাওয়ার পেছনে মূল কারণ কী? কেন একসময় শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি ব্যাংক এত দ্রুত আর্থিক দুরবস্থায় পড়ল? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, কেন গ্রাহকদের আস্থা এখনো ফিরছে না?
ব্যাংকিং ব্যবসার মূল ভিত্তি হলো আস্থা। একজন গ্রাহক তাঁর সঞ্চিত অর্থ ব্যাংকে রাখেন এই বিশ্বাসে যে, প্রয়োজনে তিনি সেই অর্থ নিরাপদে ফেরত পাবেন। কিন্তু যখন কোনো ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার অবনতি ঘটে, নেতৃত্বের সংকট তৈরি হয় এবং ব্যবস্থাপনায় অনিশ্চয়তা দেখা দেয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। শুধু আর্থিক লোকসান দিয়ে এই আস্থার সংকট ব্যাখ্যা করা যাবে না; এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা ও সুশাসনের প্রশ্ন।
ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় নেতৃত্বের ঘাটতির বিষয়টি সামনে আসছে। একটি বড় ব্যাংক পরিচালনার জন্য প্রয়োজন দক্ষ, অভিজ্ঞ ও পেশাদার নেতৃত্ব। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকে হতে হবে জবাবদিহিমূলক এবং ব্যবস্থাপনাকে হতে হবে পেশাদার। কিন্তু ব্যাংক যদি রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়, তাহলে সেখানে ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তের চেয়ে ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত স্বার্থ প্রাধান্য পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
ইসলামী ব্যাংক একসময় দেশের ব্যাংকিং খাতে একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছিল। গ্রাহকসেবা, বিনিয়োগ, আমানত সংগ্রহ এবং ব্যবসায়িক সম্প্রসারণে ব্যাংকটির উল্লেখযোগ্য সাফল্য ছিল। সেই ব্যাংকের এমন পরিস্থিতিতে পড়া শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সংকট নয়; এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্যও উদ্বেগজনক সংকেত।
অভিজ্ঞ ব্যাংকারদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য হলো, ব্যাংককে ব্যাংকের মতো চলতে দিতে হবে। কোনো রাজনৈতিক দল, বিশেষ গোষ্ঠী কিংবা সংগঠনের প্রভাবমুক্ত থেকে ব্যাংক পরিচালিত হওয়া জরুরি। ব্যাংক পরিচালনার দায়িত্ব পেশাদার ব্যাংকারদের হাতে থাকা উচিত। ইসলামী ব্যাংকিংয়ের নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে, তবে তার অর্থ এই নয় যে, ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কোনো বিশেষ ফোরাম বা গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে।
এখানে মনে রাখতে হবে, ব্যাংক কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পদ নয়, কোনো গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানও নয়। এটি আমানতকারীদের অর্থে পরিচালিত একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে লাখো গ্রাহকের সঞ্চয়, বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ এবং দেশের অর্থনীতির স্থিতিশীলতা।
তাই ইসলামী ব্যাংকের সংকট উত্তরণে প্রথমেই প্রয়োজন কার্যকর ও যোগ্য নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা। পাশাপাশি বিনিয়োগের গুণগত মান যাচাই, খেলাপি বিনিয়োগ ও অনাদায়ি অর্থ আদায়, আর্থিক অনিয়মের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা জরুরি। শুধু নতুন পর্ষদ গঠন কিংবা নেতৃত্ব পরিবর্তন করলেই হবে না; ব্যাংকের ভেতরে সুশাসন ও জবাবদিহির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থার প্রকৃত চিত্র প্রকাশ এবং পুনরুদ্ধারের বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণ করাও জরুরি। আমানতকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে কিংবা বিনিয়োগের মান উন্নত না করে শুধু আশ্বাস দিয়ে আস্থা ফেরানো সম্ভব নয়।
সবশেষে বলা যায়, ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান লোকসান একটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক বিপর্যয়ের চেয়েও বড় বার্তা দিচ্ছে। এটি দেখিয়ে দিচ্ছে, রাজনৈতিক প্রভাব, নেতৃত্বের সংকট ও দুর্বল সুশাসন একটি শক্তিশালী ব্যাংককেও বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে। তাই এখনই প্রয়োজন ব্যাংকটিকে রাজনৈতিক ও গোষ্ঠীগত প্রভাবমুক্ত করে পেশাদার ব্যবস্থাপনায় ফিরিয়ে আনা। কারণ ব্যাংকের মালিকানা ও স্বার্থ সবার আগে আমানতকারীদের। ব্যাংককে ব্যাংকের মতো চলতে দেওয়াই হোক ইসলামী ব্যাংক পুনরুদ্ধারের প্রথম শর্ত।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংক দখল করে চট্টগ্রামের এস আলম গ্রুপ। এরপর ব্যাংকটি থেকে নামে-বেনামে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা তুলে নেয় গ্রুপটি। যার সবই খেলাপি হয়ে পড়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা হারানোর পর ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ হারায় এস আলম গ্রুপ। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ব্যাংকটি পরিচালনার দায়িত্ব পান স্বতন্ত্র পরিচালকেরা। বিএনপি সরকার এসে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমকে চেয়ারম্যান করলে আন্দোলনে নামে গ্রাহক নামে কিছু লোক। তাকে সরিয়ে দিয়ে এখন দায়িত্ব নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
Comments