আসন্ন বাজেটে যেসব পণ্যের দাম কমতে ও বাড়তে পারে
স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিতে এবং সাধারণ ভোক্তার ওপর করের বোঝা কমাতে আসন্ন বাজেটে বড় ধরনের শুল্ক ও করছাড়ের পরিকল্পনা করছে সরকার। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, আগামী ১১ জুনের বাজেটে বিভিন্ন খাতে ভ্যাট কমানো, করছাড়ের মেয়াদ বৃদ্ধি এবং আমদানি শুল্ক সমন্বয়ের মতো একাধিক জনবান্ধব ঘোষণা আসতে পারে।
এনবিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, এবারের বাজেটে প্রান্তিক করদাতাদের যথাসম্ভব করের চাপ থেকে রেহাই দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। অন্যদিকে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে ভ্যাট ও শুল্ক ছাড়ের মেয়াদ ২০৩০ থেকে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
যেসব পণ্যের দাম কমতে পারে:
১. স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত এসি ও রেফ্রিজারেটর:
বিগত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে ফ্রিজ ও এসির উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট ৭.৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছিল। এর ফলে গত এক বছরে দেশীয় পণ্যের চেয়ে আমদানি ১০ শতাংশের বেশি বেড়ে যায়। দেশীয় শিল্প রক্ষা করতে এবার এসি ও রেফ্রিজারেটরের উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে পুনরায় ৭.৫ শতাংশ করা হতে পারে। এই সুবিধার মেয়াদ ২০৩০ সাল পর্যন্ত বহাল রাখার প্রস্তাব আসতে পারে।
২. স্বর্ণ ও স্বর্ণালঙ্কার:
স্বর্ণালঙ্কার ক্রেতাদের জন্য আসছে বড় সুখবর। বর্তমানে স্বর্ণ বিক্রিতে প্রতি ভরিতে ৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হয়, যা প্রায় ১২,৫০০ টাকা। নতুন বাজেটে এই নিয়মের পরিবর্তে প্রতি ভরিতে নির্দিষ্ট (ফিক্সড) ভ্যাট ২,৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হতে পারে। এছাড়া স্বর্ণালঙ্কার বিক্রিতে উৎসে কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে মাত্র ০.৫ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে। এর ফলে বিশ্ববাজার স্থিতিশীল থাকলে দেশে স্বর্ণের দাম উল্লেখযোগ্য হারে কমবে।
৩. ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম:
জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে ৬৮ ধরনের ওষুধ তৈরির কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ককর অব্যাহতি দেওয়া হতে পারে। পাশাপাশি কিডনি ডায়ালাইসিসের উপকরণ, কার্ডিয়াক স্টেন্ট (হার্টের রিং) এবং চোখের লেন্স আমদানি ও সরবরাহে ভ্যাট-কর কমানোর প্রস্তাব আসছে।
৪. শিশুখাদ্য, খেজুর ও নিত্যপণ্য:
- শিশুখাদ্য তৈরির কাঁচামালের আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হতে পারে।
- রমজান ও সাধারণ সময়ে বহুল ব্যবহৃত খেজুর আমদানির ওপর থেকে বিদ্যমান ৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক পুরোপুরি প্রত্যাহার হতে পারে।
- গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি ও মাছসহ নতুন আরও ৩৩টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যকে হ্রাসকৃত (০.৫%) উৎসে করের তালিকায় যুক্ত করা হচ্ছে। বর্তমানে এসব পণ্যে ১ থেকে ৫ শতাংশ উৎসে কর রয়েছে।
৫. মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপ:
স্থানীয়ভাবে মোবাইল ফোন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ২২ ধরনের কাঁচামাল আমদানিতে অগ্রিম আয়কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ বা ২ শতাংশ করা হতে পারে। এছাড়া ল্যাপটপ ও কম্পিউটারের বেশ কিছু যন্ত্রাংশে শুল্ক কমানোর প্রস্তাব আসতে পারে।
৬. কৃষি সরঞ্জাম ও অন্যান্য:
কীটনাশক ও বালাইনাশকের ৩০টিরও বেশি কাঁচামাল আমদানিতে ভ্যাট প্রত্যাহার এবং জিঙ্ক সালফেট সার উৎপাদনের মূল কাঁচামাল 'জিঙ্ক অ্যাশ' আমদানির ওপর থেকে শুল্ক সম্পূর্ণ তুলে নেওয়া হতে পারে। এছাড়া ওয়াশিং মেশিন, ব্লেন্ডার, ওভেন, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও সোলার প্যানেলের যন্ত্রাংশে করছাড়ের মেয়াদ বাড়ছে।
সিমকার্ডে নতুন ভ্যাট নিয়ম: মোবাইল ফোনের সিমকার্ড বিক্রিতে বর্তমানে নির্দিষ্ট ৩০০ টাকা ভ্যাটের পরিবর্তে সিমের বিক্রয়মূল্যের ওপর সরাসরি ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব আসতে পারে।
যেসব পণ্যের দাম বাড়তে পারে:
আসন্ন বাজেটে দেশীয় শিল্প রক্ষা এবং ক্ষতিকর পণ্যের ব্যবহার নিরুৎসাহিত করতে কিছু খাতের কর ও শুল্ক বাড়ানোর প্রস্তাব করা হচ্ছে। ফলে এসব পণ্যের দাম বাড়তে পারে:
- তামাকজাত পণ্য: বিড়ি ও সিগারেটসহ সব ধরনের তামাকপণ্যের মূল্যস্তর প্রায় ১৫ শতাংশ বাড়তে পারে। এর ফলে প্রতি স্টিক সিগারেটের দাম ১ টাকা থেকে ৩ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। এছাড়া নিকোটিন পাউচে সম্পূরক শুল্ক ৪০ শতাংশ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
- রড ও ইস্পাত: নির্মাণ খাতের অন্যতম প্রধান উপাদান রডসহ ইস্পাত পণ্যের ভ্যাট টন প্রতি ১৫০ টাকা থেকে ৩৫০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে।
- আমদানিকৃত কাজু বাদাম: স্থানীয় কাজু বাদাম চাষ ও শিল্পকে উৎসাহিত করতে আমদানিকৃত কাজু বাদামের শুল্ক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করার প্রস্তাব আসতে পারে।
- দেশীয় মদ: দেশে উৎপাদিত মদের ওপর প্রতি লিটারে ৫০০ টাকা ভ্যাট আরোপ করা হতে পারে।
Comments