কোন যুদ্ধেও কি এত শিশু এত কম সময়ে মারা যায়?
মধ্য মার্চ থেকে বাংলাদেশ এক হৃদয়বিদারক জনস্বাস্থ্য সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একের পর এক শিশু হাম ও মারাত্মক সংক্রমণের জটিলতায় মারা যাচ্ছে, যে মৃত্যুগুলোর অনেকটাই প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল। কেউ তীব্র জ্বরে পুড়ে মারা গেছে, কেউ অক্সিজেনের অভাবে শ্বাস নিতে নিতে শেষ নিঃশ্বাস ফেলেছে, আবার কেউ সময়মতো আইসিইউ না পেয়ে জীবন হারিয়েছে। এখন অসংখ্য পরিবার একই প্রশ্ন করছে-এত শিশু একসঙ্গে এত অসহায় হয়ে পড়ল কীভাবে?
এটি শুধু একটি স্বাস্থ্য সংকট নয়; সমাজের জন্য এক কঠিন নৈতিক পরীক্ষা।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে হাসপাতালগুলো অসুস্থ শিশুর ভিড়ে উপচে পড়ছে। দূর-দূরান্তের জেলা থেকে বাবা-মায়েরা সন্তানদের কোলে নিয়ে ঢাকায় ছুটে এসেছেন-শেষ আশায়, হয়তো চিকিৎসা পেলে সন্তান বাঁচবে। হাসপাতালের করিডরে পরিবারগুলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছে একটি আইসিইউ বেডের জন্য, যা অনেক সময় আর পাওয়া যাচ্ছে না। চিকিৎসক ও নার্সরা সামর্থ্যের বাইরে কাজ করছেন। অক্সিজেন সংকট, দেরিতে রোগী স্থানান্তর এবং পর্যাপ্ত শিশু আইসিইউ না থাকায় বহু পরিস্থিতি মর্মান্তিক পরিণতিতে গড়াচ্ছে।
প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে একটি ভেঙে পড়া পরিবার।
একটি শিশুর মৃত্যু কখনোই কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়। এটি এমন একটি ভবিষ্যৎ, যা শুরু হওয়ার আগেই নিভে গেল। সেই শিশু হয়তো একদিন শিক্ষক, শিল্পী, ডাক্তার বা পরিবারের অত্যন্ত প্রিয় একজন মানুষ হয়ে উঠত। কিন্তু সে আর নেই। একজন মায়ের পৃথিবী থেমে যায়। একজন বাবা এমন এক নীরব শোক বয়ে বেড়ান, যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।
সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো-হাম কোনো অজানা রোগ নয়। বাংলাদেশ বহু বছর ধরেই সফলভাবে হাম প্রতিরোধ করে এসেছে। টিকা আছে, টিকাদান কর্মসূচি আছে, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার দীর্ঘ অভিজ্ঞতাও আছে। সাধারণত তখনই হাম ভয়াবহ রূপ নেয়, যখন স্বাস্থ্যব্যবস্থা সময়মতো ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের কাছে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়।
এ পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, অধিকাংশ শিশুই ইতোমধ্যে টিকা পেয়েছে এবং সংক্রমণ শিগগির কমে আসতে পারে। কিন্তু অনেক মানুষ এতে আশ্বস্ত হতে পারছেন না, কারণ মৃত্যুর মিছিল এখনো থামেনি। হাসপাতালের ভিড় সরকারি আশ্বাসের চেয়ে ভিন্ন বাস্তবতার কথা বলছে। সরকারি বক্তব্য আর সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতার এই ফারাক মানুষের মধ্যে ভয় ও অবিশ্বাস বাড়িয়েছে।
এখন প্রশ্ন উঠছে টিকা ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যখাতের প্রস্তুতি এবং সাম্প্রতিক প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে। সমালোচকদের মতে, টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় পরিবর্তন এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দেশের টিকাদান কার্যক্রমকে দুর্বল করে ফেলেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনিসেফ ইউনূস সরকারকে আগেই সতর্ক করেছিল। এতে উদ্বেগ আরও বাড়ে, কারণ তা হলে বোঝা যায়, প্রতিরোধের সুযোগ হাতছাড়া করেছেন নোবেল জয়ী।
শিশুরা এমন এক রোগে মারা যাচ্ছে, যা মূলত প্রতিরোধযোগ্য।
এই সংকট বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার আরেকটি কঠিন বাস্তবতাও সামনে এনে দিয়েছে-বৈষম্য। সচ্ছল পরিবারগুলো তুলনামূলক দ্রুত বেসরকারি হাসপাতাল, অক্সিজেন বা আইসিইউ সুবিধা পায়। কিন্তু গ্রামের দরিদ্র পরিবার বা নিম্নআয়ের মানুষ অনেক বেশি ঝুঁকিতে থাকে। অনেকে হাসপাতালে পৌঁছাতেই দেরি করে ফেলেন-কারণ যাতায়াত ব্যয়বহুল, স্থানীয় চিকিৎসা ব্যবস্থা দুর্বল, অথবা তারা রোগের ভয়াবহতা সময়মতো বুঝতে পারেন না।
অপুষ্টিও পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। শরীর আগে থেকেই দুর্বল থাকলে হাম মারাত্মক হয়ে ওঠে। সুস্থ একটি শিশু হয়তো গুরুতর সংক্রমণ কাটিয়ে উঠতে পারে, কিন্তু অপুষ্ট শিশুর প্রতিরোধক্ষমতা অনেক কম। দারিদ্র্য ও খাদ্যসংকট তাই হাসপাতালের দরজায় পৌঁছানোর আগেই রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
এ কারণেই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু জরুরি চিকিৎসা দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। প্রয়োজন তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ ব্যবস্থা।
কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ এখন অত্যন্ত প্রয়োজন।
প্রথমত, কী কী ভুল হয়েছে তা দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে তদন্ত করতে হবে। টিকা সরবরাহ, বিতরণ, সমন্বয় বা প্রস্তুতিতে যদি ব্যর্থতা থেকে থাকে, তাহলে জনগণের সত্য জানার অধিকার আছে। জবাবদিহি রাজনৈতিক প্রতিশোধের জন্য নয়; ভবিষ্যতে এমন মৃত্যু ঠেকানোর জন্য জরুরি।
দ্বিতীয়ত, এখনো যেসব শিশু টিকার বাইরে রয়েছে, তাদের দ্রুত আওতায় আনতে হবে। জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুধু শহরে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; প্রত্যন্ত গ্রাম, বস্তি ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছেও পৌঁছাতে হবে। মানুষকে বিজ্ঞানভিত্তিক, পরিষ্কার ও নির্ভরযোগ্য তথ্য দিতে হবে, যাতে ভয় বা গুজব টিকা নেওয়ার পথে বাধা না হয়।
তৃতীয়ত, হাসপাতালগুলোকে দ্রুত শক্তিশালী করতে হবে। শিশু আইসিইউ বাড়াতে হবে জরুরি ভিত্তিতে—প্রয়োজনে বেসরকারি হাসপাতালের সহযোগিতা নিয়ে। একটি শিশুও যেন শুধু আইসিইউ বেডের অভাবে মারা না যায়। একই সঙ্গে অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থাও জোরদার করতে হবে।
চতুর্থত, দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য আর্থিক ও যাতায়াত সহায়তা দরকার। অনেক বাবা-মায়ের পক্ষে বারবার শহরে আসা বা দীর্ঘদিন থাকার খরচ বহন করা সম্ভব নয়। স্থানীয় চিকিৎসাকেন্দ্র, অস্থায়ী আইসোলেশন সুবিধা ও জরুরি সহায়তা তহবিল এই কষ্ট অনেকটা কমাতে পারে।
দেশের এখন প্রয়োজন সত্য, প্রচারণা নয়।
এমন সময়ে সরকার অনেক সময় নিজেদের ভাবমূর্তি রক্ষায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে, বিরোধীরা শোককে রাজনৈতিক অস্ত্র বানাতে চায়, আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু জনস্বাস্থ্য সংকট কখনো অস্বীকার বা রাজনৈতিক নাটক দিয়ে সমাধান করা যায় না। মানুষকে সঠিক তথ্য জানতে হবে-কোথায় টিকা পাওয়া যাচ্ছে, কোন উপসর্গ বিপজ্জনক, কীভাবে জটিলতা এড়ানো যায়, কোথায় জরুরি চিকিৎসা মিলবে।
বাংলাদেশ কোনো যুদ্ধক্ষেত্র নয়। তবু প্রতিরোধযোগ্য রোগে শত শত শিশুর মৃত্যুর দৃশ্য এমন এক জাতীয় শোক তৈরি করেছে, যা সাধারণত যুদ্ধ বা বড় বিপর্যয়ের সময় দেখা যায়। এই শোক আমাদের বাধ্য করছে স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ, জরুরি প্রস্তুতি, পুষ্টিনীতি এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা নিয়ে কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে।
Comments