ভারতে কেন বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী মনোভাব?
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্ক এখন এক জটিল সন্ধিক্ষণে। যদিও দুই দেশের রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক আপাতদৃষ্টিতে অটুট, তবে ভারতের জনমনে এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী মনোভাব ক্রমেই দানা বাঁধছে। ডয়চে ভেলের এক প্রতিবেদনে এই পরিবর্তনের পেছনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ উঠে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কিছু মন্তব্য ভারতীয়দের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি করেছে। সামাজিক মাধ্যমে ভারতকে 'হেলহোল' বা নরকের মতো জায়গা হিসেবে উল্লেখ করা একটি বিতর্কিত পোস্ট শেয়ার করেন ট্রাম্প। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একে 'অজ্ঞতাপ্রসূত ও রুচিহীন' বলে তীব্র সমালোচনা করেছে। এটি দীর্ঘদিনের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের পরিপন্থী বলে মনে করছে দিল্লি।
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ ভারতের অর্থনীতিতে সরাসরি আঘাত হেনেছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ায় এবং সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় ভারতে তেলের দাম বেড়েছে। রুপির মান রেকর্ড পরিমাণ কমে যাওয়া এবং শেয়ারবাজারে পতনের ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে, যার দায় ভারতীয়রা যুক্তরাষ্ট্রের নীতির ওপর চাপাচ্ছে।
২০২৫ সালের মাঝামাঝি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু নীতি ভারতকে ক্ষুব্ধ করেছে: ভারতের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে ওয়াশিংটন, যা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অস্বাভাবিক। ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনায় যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে এককভাবে লক্ষ্যবস্তু করেছে, যা সাবেক কূটনীতিকদের মতে 'শত্রুতাপূর্ণ আচরণ'। ট্রাম্প নিজেকে কাশ্মীর ইস্যুতে মধ্যস্থতাকারী দাবি করলে ভারত তা কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করে, যা কূটনৈতিক টানাপোড়েন বাড়িয়েছে।
ভারতের যে ডানপন্থি ব্যবসায়িক গোষ্ঠী একসময় আদর্শগত কারণে ট্রাম্পের সমর্থক ছিল, ব্যবসায়িক ক্ষতির কারণে তারা এখন ক্ষুব্ধ। এছাড়া জনমত গঠনে বড় ভূমিকা রাখছে সোশ্যাল মিডিয়া: নিতেশ রাজপুত বা অভিজিৎ চাভদার মতো প্রভাবশালী ইউটিউবাররা এখন যুক্তরাষ্ট্রের 'ভালো বন্ধু' বয়ান থেকে সরে এসে কড়া সমালোচনা করছেন।
আগে ভারতীয় মূলধারার মিডিয়া যতটা যুক্তরাষ্ট্রপন্থি ছিল, এখন তাদের কাভারেজে অনেক বেশি ভারসাম্য ও সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি দেখা যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক এখন আর কেবল আদর্শিক নয়, বরং পুরোপুরি 'লেনদেনভিত্তিক' হয়ে উঠছে। ভারতের নীতিনির্ধারকরা এখন সম্পর্ক বজায় রাখছেন মূলত চীনকে মোকাবিলা এবং অর্থনৈতিক প্রয়োজনে। তবে ভেতরে ভেতরে যে অবিশ্বাসের দেয়াল তৈরি হচ্ছে, তা দীর্ঘমেয়াদে এই দুই শক্তির কৌশলগত অংশীদারিত্বকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে।
Comments