ইউনুস জামানায় ম্যাজিকের প্রতিশ্রুতি, অর্থনীতিতে বাস্তবতার ভাটা
২০২৪ এর ৫ আগস্টের পর থেকে দেশের অর্থনীতিতে "ইউনুস ম্যাজিক", অনেক উচ্চারিত শব্দ ছিল। ভাবটা এমন ছিল অধ্যাপক ইউনুসের দুনিয়াব্যাপী পরিচয় আর বড় বড় বিশ্ব নেতার সাথে তার খাতিরের কারণে বাংলাদেশ বিদেশি বিনিয়োগে সয়লাব হয়ে যাবে। এবং সেরকম একটা ধারণা দেয়াও হয়েছিল সরকার ও তার সমর্থকদের দিক থেকে। বলা হয়েছিল, বিদেশি বিনিয়োগের বন্যা বইবে, কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত খুলবে, বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার শিল্পকেন্দ্রে পরিণত হবে।
কিন্তু বাস্তবতার আয়নায় দাঁড়ালে দেখা যায়, এই সময়টিতে অর্থনীতির প্রায় সব সূচকই নিম্নমুখী। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিছুটা বাড়া ছাড়া দৃশ্যমান কোনো বড় ইতিবাচক পরিবর্তন চোখে পড়ে না। আর সেই রিজার্ভ বৃদ্ধিও মূলত প্রবাসী আয়, আমদানি কমে যাওয়া এবং খোলা বাজার থেকে ডলার কিনে সঞ্চয় করার ফল।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকাশিত ব্যালান্স অব পেমেন্ট (বিওপি)-এর সর্বশেষ তথ্যই অর্থনীতির এই বাস্তবতা তুলে ধরে। চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩.৮০ বিলিয়ন ডলারে। গত অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল ১১.৭৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ঘাটতি বেড়েছে দুই বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।
এর পেছনের কারণও স্পষ্ট। রপ্তানি কমেছে, আমদানি বেড়েছে। গত অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে রপ্তানি আয় ছিল ২৬.৩৭ বিলিয়ন ডলার, যা চলতি অর্থবছরের একই সময়ে কমে দাঁড়িয়েছে ২৬.০৯ বিলিয়ন ডলারে। অন্যদিকে আমদানি ব্যয় বেড়ে ৩৮.১১ বিলিয়ন ডলার থেকে ৩৯.৮৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ফলে বাণিজ্য ভারসাম্যে চাপ আরও বেড়েছে।
অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, এই প্রবণতা অর্থনীতির মৌলিক দুর্বলতারই প্রতিফলন। আমদানি বৃদ্ধি ও রপ্তানি হ্রাসের কারণেই মূলত বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে।
অন্যদিকে ইউনুস আমলের বিনিয়োগ পরিস্থিতিও আশাব্যঞ্জক নয়। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে গত দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। গত ডিসেম্বর শেষে এ প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬.১০ শতাংশে। অথচ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতিতে ডিসেম্বর পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭.২ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি খাতে মোট ঋণস্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। এক বছর আগে যা ছিল ১৬ লাখ ৮৫ হাজার ২৭১ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে ঋণ বেড়েছে মাত্র ৬.১০ শতাংশ হারে—যা নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য অত্যন্ত দুর্বল প্রবৃদ্ধি।
অন্তবর্তী সরকারের আমলে বেসরকারি বিনিয়োগের হারও কমেছে। ২০২৩–২৪ অর্থবছরে জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ছিল ২৩.৫১ শতাংশ, যা ২০২৪–২৫ অর্থবছরে কমে ২২.৪৮ শতাংশে নেমেছে। একই সময়ে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি ১৯ শতাংশ কমে ২৮১ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে—যা ভবিষ্যৎ শিল্প বিনিয়োগের জন্য উদ্বেগজনক সংকেত।
বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রেও প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। ২০২৪-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন নেতৃত্বের মাধ্যমে বড় ধরনের পরিবর্তনের কথা বলা হলেও বাস্তবে পরিস্থিতি উল্টো হয়েছে। সর্বশেষ অর্থবছরে দেশে নতুন বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে মাত্র ৫৫ কোটি ডলার, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
করোনাকালেও যেখানে নতুন বিনিয়োগ এসেছিল ৭২ কোটি ডলার, সেখানে ইউনুস আমলে তা আরও কমে যাওয়া অর্থনীতির জন্য স্পষ্ট নেতিবাচক বার্তা বহন করে। প্রতিযোগী দেশগুলো যখন বিদেশি বিনিয়োগ টানতে সক্ষম হচ্ছে, তখন বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে। শুধু তাই নয়, অন্তবর্তী সরকাএর দেড় বছরে শত শত কারখানা বন্ধ হয়েছে, লাখ লাখ শ্রমিক বেকার হয়েছে। বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে কারখানা বন্ধ ঠেকানোর চেষ্টাও ছিল না।
শুধু বিনিয়োগ নয়, শ্রমবাজারেও আশানুরূপ অগ্রগতি নেই। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বিদেশে পাড়ি দেওয়া বাংলাদেশি কর্মীর সংখ্যা ডিসেম্বরের তুলনায় ২১ শতাংশেরও বেশি কমেছে। বিদেশে কর্মসংস্থানের এই হ্রাসও দেশের শ্রমবাজারে চাপ বাড়ার ইঙ্গিত দেয়।
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, অর্থনীতির বাস্তব চিত্র ও রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে। রিজার্ভ কিছুটা বাড়লেও তার বড় অংশ এসেছে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ, আমদানি হ্রাস এবং বাজার থেকে ডলার সংগ্রহের মাধ্যমে। কিন্তু বিনিয়োগ, রপ্তানি, কর্মসংস্থান বা ঋণপ্রবাহ-কোনো ক্ষেত্রেই বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন দৃশ্যমান নয়।
অর্থনীতির ভাষায় উন্নয়ন কেবল কথায় নয়, সূচকে প্রতিফলিত হয়। আর সেই সূচকগুলোই বলছে-প্রতিশ্রুতির জোয়ার থাকলেও বাস্তব অর্থনীতিতে এখনো সেই "ম্যাজিক" তিনি দেখাতে পারেননি।
অর্থনীতির বাস্তবতা শেষ পর্যন্ত সংখ্যাতেই ধরা পড়ে। বক্তৃতা, প্রচার কিংবা প্রতিশ্রুতিতে নয়। গত সময়টিতে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে, বিনিয়োগের জোয়ার আসবে, কর্মসংস্থানের বিস্ফোরণ ঘটবে—এমন বহু উচ্চকিত প্রত্যাশা তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তব পরিসংখ্যান বলছে, সেই প্রত্যাশা কাগজেই রয়ে গেছে।
রিজার্ভের সামান্য উন্নতিকে সাফল্যের গল্প হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা যতই করা হোক, বিনিয়োগ, রপ্তানি, ঋণপ্রবাহ ও কর্মসংস্থানের মতো মৌলিক সূচকগুলো যদি ক্রমাগত দুর্বল হয়, তাহলে সেই গল্প টেকসই হয় না। অর্থনীতি শেষ পর্যন্ত প্রচারণায় নয়, উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে।
প্রশ্ন তাই থেকেই যায়-যে 'ম্যাজিক'-এর প্রতিশ্রুতি দিয়ে এত প্রত্যাশা তৈরি করা হয়েছিল, তা কেন বাস্তব অর্থনীতিতে রূপ নিল না?
Comments