ইউনুস শাসনামলে বাংলাদেশের নারীরা ছিল নিরাপত্তাহীন!
আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। বিশ্বজুড়ে নারীর অধিকার, মর্যাদা ও অবদানের স্বীকৃতির দিন। এই দিনে আমরা স্মরণ করি সেই সব নারীদের, যাদের ত্যাগ, শ্রম ও প্রজ্ঞায় মানবসভ্যতা এগিয়ে চলেছে, এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ। কিন্তু উৎসবমুখর এই দিনেও বাংলাদেশের বাস্তবতা অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়। বিশেষ করে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নারীদের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও মর্যাদার প্রশ্ন নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে এক অস্থির সময় পার হয়েছে বলে অনেক পর্যবেক্ষকের মত। শান্তিতে নোবেল বিজয়ী মোহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী শাসনের সময়কাল নিয়ে নানা বিতর্ক ও সমালোচনা তৈরি হয়েছে। তার আমলে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নারীদের নিরাপত্তাকে বিশেষভাবে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছিল। ধর্ষণ,যৌন হয়রানি,সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপমান ও সাইবার বুলিং-এসব ঘটনার খবর নিয়মিতই সামনে এসেছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক বছরে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলার সংখ্যা প্রায় ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে ধর্ষণের মামলা বেড়েছে ২৭ শতাংশের বেশি। নারী নির্যাতনের মোট মামলার প্রায় এক-তৃতীয়াংশই ধর্ষণের অভিযোগ সম্পর্কিত। এই পরিসংখ্যান শুধু অপরাধের সংখ্যা বাড়ার ইঙ্গিতই দেয় না, বরং নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগের কথাও প্রকাশ করে।
সাম্প্রতিক সামাজিক বাস্তবতায় নারীরা নানা ধরনের 'মোরাল পুলিশিং'-এর মুখোমুখি হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। হিজাব বা ওড়না না পরা, পোশাকের ধরন, কিংবা জনসমক্ষে আচরণ-এসব বিষয়কে কেন্দ্র করে নারীদের অপমান বা শারীরিক আক্রমণের ঘটনাও সামনে এসেছে। এমনকি দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর একটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গাতেও পোশাকের অজুহাতে নারীর ওপর হামলা হয়েছে। সেই হামলাকারীকে আবার সম্বর্ধনাও দিয়েছে ধর্মবাদী কিছু মানুষ।
এসব ঘটনার আরও উদ্বেগজনক দিক হলো,অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে বিচারহীনতার সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হয়েছে। প্রশাসনিক উদাসীনতা এবং আইনের প্রয়োগে দুর্বলতা এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও গণআন্দোলনের সময় নারীরা সামনে থেকে অংশগ্রহণ করেছিলেন। আন্দোলনের মিছিল,সংগঠন ও প্রচারণায় তরুণী,শিক্ষার্থী,পেশাজীবী-সব শ্রেণির নারীর সক্রিয় উপস্থিতি ছিল। কিন্তু আন্দোলনের পরবর্তী সময়ে অনেক নারী কর্মীই সাইবার বুলিং,স্লাট শেমিং ও ব্যক্তিগত আক্রমণের শিকার হয়েছে। যারা একসময় আন্দোলনের প্রতীক হিসেবে প্রশংসিত ছিলেন,তাদের অনেককেই পরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপমান ও হেনস্তার মুখে পড়তে হয়েছে।
ইউনুস শাসনের পুরো সময়েই ধর্মীয় গোঁড়ামি ও সামাজিক রক্ষণশীলতার উত্থান হয়েছে। কিছু উগ্র গোষ্ঠী নারীদের পোশাক, চলাফেরা, কর্মক্ষেত্রে উপস্থিতি এমনকি জনসমক্ষে থাকা নিয়েও বিধিনিষেধ আরোপের চেষ্টা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। "নারীর স্থান ঘরে"-এই ধরনের বক্তব্যের মাধ্যমে নারীর সামাজিক ভূমিকা সীমিত করার প্রচেষ্টা সমাজের বিভিন্ন স্তরে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এই বাস্তবতায় নারীরা নিজেদের মৌলিক অধিকার-শিক্ষা, কর্মসংস্থান, স্বাধীন চলাচল এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা-নিয়ে নতুন করে চিন্তিত হয়ে পড়েছে। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, গণপরিসরে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে সমাজের সামগ্রিক অগ্রগতি ব্যাহত হবে। কারণ নারীর অংশগ্রহণ ছাড়া অর্থনৈতিক,সামাজিক বা সাংস্কৃতিক উন্নয়ন কখনোই পূর্ণতা পায় না।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন এই প্রেক্ষাপটে নতুন আশা তৈরি করেছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এসেছে। দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। অনেক নারী ভোটার আশা করছেন, নতুন সরকার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাবে এবং নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেবে।
শুধু আইন প্রয়োগ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। নারীর প্রতি সম্মান, সমতা এবং মানবাধিকারের মূল্যবোধ সমাজের প্রতিটি স্তরে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। পরিবার,শিক্ষা প্রতিষ্ঠান,গণমাধ্যম এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব-সবাইকে এ বিষয়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
একই সঙ্গে অনেকেই বলছেন,এখন সময় এসেছে নারীর অধিকার আন্দোলনের একটি নতুন পর্যায়ের। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যে 'চতুর্থ তরঙ্গের নারীবাদ' নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, বাংলাদেশেও তেমন একটি সমন্বিত আন্দোলনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। এই আন্দোলন শুধু নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে নয়; বরং মৌলবাদ, সামাজিক বৈষম্য, অর্থনৈতিক বঞ্চনা এবং সাংস্কৃতিক সংকীর্ণতার বিরুদ্ধেও হতে হবে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে নারীরা কখনোই সম্পূর্ণ নিরাপদ ছিলেন না-এ সত্য স্বীকার করতে হয়। তবুও তারা প্রতিটি সংকটের সময় সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই করেছেন। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ,গণতন্ত্রের আন্দোলন থেকে সামাজিক পরিবর্তনের সংগ্রাম-সব ক্ষেত্রেই নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
আজকের নারী দিবসে তাই শুধু উদ্বেগ নয়,প্রতিজ্ঞার কথাও উচ্চারিত হওয়া দরকার। এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে হবে যেখানে নারী তার পোশাক, পেশা, শিক্ষা বা মতামতের জন্য অপমানিত হবে না; যেখানে সে নিরাপদে চলাফেরা করতে পারবে; যেখানে তার স্বপ্ন দেখার অধিকার কেউ কেড়ে নিতে পারবে না।
আশা করা যায়,নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় রাষ্ট্র,সমাজ এবং নাগরিক সবাই মিলে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করবে যেখানে নারীর মর্যাদা,নিরাপত্তা ও সমানাধিকারের নিশ্চয়তা থাকবে। তাহলেই আন্তর্জাতিক নারী দিবস শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়,বরং বাস্তব পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে উঠবে।
Comments