সোশ্যাল মিডিয়ায় এআই ব্যবহার করে তারকাদের চরিত্রহনন জঘন্য অপরাধ
সোশ্যাল মিডিয়ায় স্ক্রল করলেই এক অদ্ভুত ভয়ের অনুভূতি হয়। কখন কাকে নিয়ে কী ভুয়া কনটেন্ট বা এআই জেনারেটেড ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, তার কোনো ঠিকঠিকানা নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এআই ব্যবহার করে তারকাদের চরিত্রহনন ও ভুয়া ভিডিও ছড়ানোর প্রবণতা বর্তমানে মারাত্মক রূপ ধারণ করেছে।
প্রযুক্তির আড়ালে অন্ধকারের গল্প
আমরা সোশ্যাল মিডিয়ায় যা দেখি, তা কি সবসময় সত্যি? প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আজ বাস্তব আর কল্পনার দেয়ালটা মুছে গেছে। মাত্র কয়েক ক্লিকে বদলে যাচ্ছে মুখ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে ভুয়া, আপত্তিকর 'ডিপফেক' ভিডিও। যা ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামে মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু এই ভুয়া ভিডিওগুলোর পেছনে যে মানুষটা আছেন, তার জীবনটা নিমিষেই চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। তারকা হোক বা ঘরের পাশের কোনো মেয়ে চরিত্রহননের এই জঘন্য খেলায় মানসিক ট্রমার সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হচ্ছেন তারকারা।
যেভাবে ঘটছে অপরাধ
সম্প্রতি মাছরাঙা টেলিভিশনের ইনস্টাগ্রাম হ্যাক, পরীমনি ও মেহজাবিনের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার ঘটনাটি আমাদের ডিজিটাল নিরাপত্তার দুর্বলতা ও নৈতিক অবক্ষয়ের ভয়ংকর চিত্র উন্মোচন করেছে। এআই দিয়ে তৈরি এডিট করা ভিডিওটি প্রকাশ পওেয়ার পর মুহূর্তের মধ্যে লাখ লাখ ভিউ, হাজার হাজার শেয়ার আর কুরুচিপূর্ণ কমেন্ট আসে। যদিও মাছরাঙা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে তাদের পেজটি হ্যাক হয়েছিল। তারা দুঃখ প্রকাশও করেছে্ কিন্তু প্রশ্ন হলো, একটা ভেরিফাইড পেজের নিরাপত্তা কোথায়? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, প্রযুক্তি মানুষের সম্মান নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে, এর শেষ কোথায়?
এআইয়ের অপব্যবহার ও সাইবার ক্রাইম
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI তৈরি হয়েছিল মানুষের কাজের গতি বাড়াতে, বিজ্ঞানকে এগিয়ে নিতে। কিন্তু আমাদের দেশে বা উপমহাদেশে এআইয়ের প্রথম ও প্রধান ব্যবহার হচ্ছে অপরাধ করতে। মেহজাবিন বা পরীমণি একা নন, এর আগেও বহু তারকা এই সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়েছেন। কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই এ ধরনের ভিডিও যখন কোনো পেজ থেকে পোস্ট হয়, তখন সাধারণ মানুষ সেটাকে সত্যি ভেবে হু হু করে শেয়ার করে। সামান্য কয়েকটা ভিউ আর মনিটাইজেশনের লোভে বা অসুস্থ মানসিকতার তৃপ্তির জন্য মানুষের জীবন ও সম্মানকে পণ্যে পরিণত করা হচ্ছে। এটি নিছক মজা নয়, সুস্পষ্ট সাইবার অপরাধ।
হলুদ সাংবাদিকতা ও কুৎসিত হেডলাইনের আত্মঘাতী রূপ
সোশ্যাল মিডিয়া আর কিছু অনলাইন পোর্টালের শিরোনাম দেখলে মনে হয় আমরা এক অসুস্থ সমাজে বাস করছি। তারকাদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে মনগড়া, কুরুচিপূর্ণ ও চটকদার হেডলাইন নিয়মিত প্রকাশ করা হচ্ছে। সামান্য একটা কথার বা ছবির ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে এমন শিরোনাম দেওয়া হয়, যা শুধু ওই তারকার পরিবার বা ক্যারিয়ার নয়, পুরো সমাজকে বিষাক্ত করে তুলছে। কে কার সাথে ঘুরল, কার সম্পর্ক ভাঙল বা কার পোশাক কেমন ছিল এসব নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ আর কদর্য আক্রমণ আমাদের মানসিকতার দেউলিয়াত্ব প্রকাশ করে। এই হলুদ সাংবাদিকতা ও ট্রোলিংয়ের সংস্কৃতি শেষ পর্যন্ত আমাদের নিজেদেরই গ্রাস করছে। আজকে আরেকজনের ক্যারেক্টার নিয়ে ট্রোল করছেন, কালকে আপনার বা আপনার পরিবারের কোনো সদস্য এআই ডিপফেকের শিকার হবে না তার নিশ্চয়তা কি আছে?
দায় কার? দায়িত্ব কি?
তারকারা বিভিন্ন সময় তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে পোস্টও দেন। শিল্পীরা আইনি লড়াইয়ে নামেন, প্রতিবাদ করেন। কিন্তু শুধু আইনি লড়াই দিয়ে কি এই মানসিকতার পরিবর্তন সম্ভব? আমাদের দর্শকদেরও দায়িত্ব আছে। কোনো অদ্ভুত বা আপত্তিকর ভিডিও দেখলে সেটা শেয়ার না করে রিপোর্ট করা উচিত। ভিউ বাড়ানোর উৎসুক জনতা না থাকলে কোনো সাইবার ক্রিমিনাল এমন নোংরা সাহস পেত না। একটি গণমাধ্যমের পেজ হ্যাক হওয়া যেমন বড় সাইবার নিরাপত্তা ত্রুটি, তেমনি সেই কনটেন্ট দেখে মুহূর্তেই তা লুফে নেওয়া আমাদের সমষ্টিগত নৈতিকতার পতন।
যা ঘটছে তা থামাতে হবে
এআই কোনো বিনোদনের হাতিয়ার নয়, এটি একটি শক্তিশালী প্রযুক্তি। একে ইতিবাচক কাজে লাগান। তারকাদেরও তো রক্ত-মাংসের শরীর, পরিবার ও সম্মান রয়েছে। পর্দায় অভিনয় করেন বলে তাদের চরিত্র হরণ করার অধিকার আপনাকে বা আমাকে কে দিয়েছে? সময় এসেছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করার। এ ধরনের অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার। নয়তো আজকের এই 'ভার্চুয়াল সন্ত্রাস' একদিন আমাদের সবার জন্যই আত্মঘাতী হয়ে দাঁড়াবে।
Comments