দ্য প্রফেসর ইন দ্য ডাগআউট, দ্য পোয়েট অন দ্য পিচ!
লিওনেল মেসি! নামটাই যথেষ্ট, তাই না? কিন্তু বিশ্বকাপ ফাইনালের এই মহাকাব্যিক মঞ্চে, স্পেনের এই চেনা ফুটবল জ্যামিতির বিরুদ্ধে, তিনি তো আর কেবল একজন ফুটবলার নন। তিনি একাধারে মহাকাব্যের লেখক, আবার সেই কাব্যের মূল চরিত্রও! মাঠের ভেতরে তিনি 'কোচ অন পিচ, আর মাঠের বাইরে তিনি 'কোচ অফ পিচ'- যিনি ড্রেসিংরুম থেকেই তরুণদের গড়ে তুলছেন স্প্যানিশ ধাঁধা মেলানোর কারিগর হিসেবে। মেসিই হতে চলেছে আরাধ্য ফাইনালের সবচেয়ে বড় অস্ত্র!
আচ্ছা, স্পেনের মূল শক্তিটা ঠিক কোথায়?
ওই যে - লা মাসিয়া বা বার্সেলোনার চেনা ঘরানার টিকিটাকা, নিখুঁত পজিশনাল প্লে আর হাই-প্রেসিং। কিন্তু নিয়তি দেখুন, যে ফুটবল দর্শনে স্পেনের শক্তি, সেই দর্শনেরই তো সর্বকালের সেরা গ্র্যাজুয়েট লিওনেল মেসি! বার্সেলোনার সেই সোনালী দিনে টিকিটাকা আর টোটাল ফুটবলের অলিগলি মেসির চেয়ে ভালো আর কে চেনে?
মাঠের ভেতরে মেসি যখন 'কোচ অন পিচ, তিনি যেন এক ঐশ্বরিক কন্ডাক্টর। তিনি খুব ভালো করেই জানেন স্পেনের প্রেসিং ট্র্যাপ কখন এবং কীভাবে কাজ করে। তাই তিনি নিজে কিছুটা নিচে নেমে এসে স্পেনের সেন্টার-ব্যাকদের সম্মোহিত করে টেনে আনেন তাদের চেনা জোন থেকে। আর ঠিক তখনই—বুম! মেসির বুট থেকে বের হয় নিখুঁত আলোর রোশনাই। মোমেন্টস তৈরি করা ম্যাজিক। এমন সব থ্রু-পাস, যা স্পেনের হাই-লাইন ডিফেন্সকে মুহূর্তে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিতে পারে।
পরিসংখ্যানও কিন্তু মেসির এই 'অন-পিচ' মায়াজালের পক্ষেই কথা বলে। একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে, যেকোনো হাই-প্রেসিং দলের বিরুদ্ধে মেসির 'পাসিং অ্যাকুরেসি ইন ফাইনাল থার্ড' এবং 'প্রোগ্রেসিভ পাসেস' দেওয়ার ক্ষমতা সাধারণের চেয়ে অনেক ওপরে। স্পেনের ডিফেন্ডাররা যখন ওপরে উঠে এসে ফাঁদ পাতবে, তখন মেসির এই নিখুঁত পাসিং রেঞ্জই হবে কাউন্টার-অ্যাটাকের মূল চাবিকাঠি। মাঠের প্রতিটি ইঞ্চি, প্রতিপক্ষের ডিফেন্সিভ লাইনের প্রতিটি ফাঁকফোকর তিনি যেভাবে রিড করেন, তা ডেটা অ্যানালিসিসেও এক পরম বিস্ময়!
মাঠের বাইরের 'কোচ'ও আসলে মেসি! সেটা কীভাবে?
সেখানেই মেসি 'কোচ অফ পিচ'। যেহেতু তিনি নিজে এই পজিশনাল ফুটবলের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বড় হয়েছেন, তাই মাঠের বাইরে তরুণ খেলোয়াড়দের কৌশলগতভাবে তৈরি করার মূল দায়িত্বটা তারই। স্পেনের এই দমবন্ধ করা পজিশনাল ফুটবলের বিরুদ্ধে কীভাবে মানসিকভাবে শান্ত থাকতে হয়, কীভাবে নিজেদের পজিশন ধরে রেখে স্পেসের জন্য অপেক্ষা করতে হয়—ড্রেসিংরুমে বসে মেসি ঠিক সেই দীক্ষাই দিচ্ছেন সতীর্থদের।
লিওনেল স্কালোনির কোচিং প্যানেলে নিঃসন্দেহে মেসির টোটকা হবে প্রস্তুত হওয়ার দারুণ সুযোগ। বাস্তব প্রমাণ তো আমাদের সামনেই আছে; কাতার বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে কোপা আমেরিকার মঞ্চগুলোতে আমরা দেখেছি কীভাবে তরুণ এনজো ফার্নান্দেজ কিংবা হুলিয়ান আলভারেজদের ট্যাকটিক্যাল ম্যাচিউরিটি এনে দিয়েছেন মেসি। স্পেনের দর্শনের ভেতরের দুর্বলতাগুলো কোথায়, লুইস দে লা ফুয়েন্তের দলের কোন ফুলব্যাকটি ডিফেন্সিভ ট্রানজিশনে একটু ধীরগতির হয়ে পড়ে—সেটা তিনি তরুণদের মগজে ঢুকিয়ে দিচ্ছেন নিখুঁত মেন্টর হিসেবে। নিজের দীর্ঘ ক্যারিয়ারের অভিজ্ঞতা ঢেলে দিয়ে জুনিয়রদের মেন্টাল ও কৌশলগত দিক থেকে তৈরি করছেন এই ফাইনালের জন্য।
সোজা কথায়, স্পেন যদি হয় এক জটিল ধাঁধার নাম, মেসি তবে তার চিরন্তন সমাধান। তিনি এখন শুধু একজন খেলোয়াড় নন, তিনি এই প্রতিপক্ষের ফুটবল ফিলোসফির সবচেয়ে বড় ডিকশনারি।
তাহলে ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে ট্রফিটা কার হাতে উঠছে? স্পেনের নিখুঁত রোবোটিক ফুটবল, নাকি টিকিটাকার মূল রাজপুত্রের নিজের হাতে লেখা শেষ মাস্টারক্লাস?
Comments