এপস্টিন কাণ্ড: ক্ষমতা, পচন এবং ‘সভ্য বিশ্ব’-এর আয়নায় নিজের মুখ
জেফ্রি এপস্টিন কাণ্ডকে যদি নিছক একজন বিকৃত ধনকুবেরের অপরাধ বলে দেখা হয়, তবে তা হবে সত্যকে ইচ্ছাকৃতভাবে ছোট করে দেখা। এপস্টিন কোনো ব্যতিক্রম নন; তিনি একটি ব্যবস্থার প্রতীক, যে ব্যবস্থা নিজেকে 'সভ্য','আইননিষ্ঠ' ও 'মানবাধিকারের রক্ষক' বলে জাহির করে,অথচ ক্ষমতার কাছে পৌঁছোলেই নৈতিকতার মেরুদণ্ড ভেঙে পড়ে।
এই কাণ্ড আমাদের বাধ্য করে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলতে - যে বিশ্ব প্রতিনিয়ত গণতন্ত্র, নারী-অধিকার ও শিশু সুরক্ষার পাঠ দেয়, সেই বিশ্ব আসলে কাদের জন্য নিরাপদ? আর কাদের জন্য আইন?
এপস্টিন ছিলেন একজন ধনী অর্থ ব্যবস্থাপক, কিন্তু তার প্রকৃত শক্তির উৎস কেবল অর্থ নয়। তার শক্তির শিকড় ছড়ানো ছিল রাজনৈতিক অভিজাতদের অন্দরমহলে, প্রশাসনিক স্তরে, এবং তথাকথিত উচ্চ সমাজের অভিজাত নেটওয়ার্কে। সেই কারণেই অপ্রাপ্তবয়স্কদের যৌন পাচার ও ধারাবাহিক যৌন নির্যাতনের মতো গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি বছরের পর বছর কার্যত ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকেছেন। যদিও তিনি গ্রেফতার হয়েছিলেন এবং তার সাজা হয়েছিল, কিন্তু সাজা ভোগ করা কালে তার মৃত্যু এখন অনেক প্রশ্ন তুলছে যে, তাকে হত্যা করা হয়েছে কিনা।
এটি কোনো কাকতালীয় ব্যর্থতা নয়। এটি একটি কাঠামোগত সত্য, যেখানে আইন সবার জন্য সমান নয়। এখানে ক্ষমতাবানদের জন্য আইন নমনীয়, আর দুর্বলদের জন্য নিষ্ঠুর।
২০০৮ সালে ফ্লোরিডায় এপস্টিন যে সমঝোতা চুক্তির মাধ্যমে ফেডারেল মামলা এড়িয়ে যান, তা আধুনিক মার্কিন বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে এক অনুচ্চারিত কলঙ্ক। সাধারণ নাগরিক হলে যে অপরাধে বহু বছরের কারাদণ্ড অবশ্যম্ভাবী ছিল, সেখানে এপস্টিন পেয়েছিলেন দিনের বেলায় কারাগারের বাইরে কাজ করার বিশেষ সুবিধা। কার্যত এটি ছিল কারাগারের ভিতরে থেকেও বাইরে থাকার লাইসেন্স।
এই চুক্তি প্রশ্ন তোলে বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে। কে এই সমঝোতা অনুমোদন করেছিল? কেন ভুক্তভোগীদের সে বিষয়ে জানানো হয়নি? কেন প্রসিকিউশন হঠাৎ থেমে গেল? এই প্রশ্নগুলোর সন্তোষজনক উত্তর আজও অধরা। জবাবদিহির এই শূন্যতাই এপস্টিন কাণ্ডের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক।
২০১৯ সালে এপস্টিন পুনরায় গ্রেপ্তার হন। ঠিক তখনই মনে হয়েছিল এবার হয়তো ক্ষমতার অন্দরমহলের দরজা খানিকটা হলেও খুলবে। প্রকাশ্য বিচার প্রক্রিয়ায় উঠে আসতে পারে সেই সব নাম, সেই সব সম্পর্ক, যা এতদিন আড়ালে ছিল।
কিন্তু সেই সম্ভাবনাও স্থায়ী হলো না।
কারাগারের ভেতর এপস্টিনের মৃত্যু, সরকারিভাবে আত্মহত্যা বলা, ঘটনার সময়, প্রেক্ষাপট এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার অস্বাভাবিক ব্যর্থতা স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহের জন্ম দেয়। দুটি ক্যামেরা অচল, পাহারাদারদের দায়িত্বে গাফিলতি-এতগুলো 'কাকতাল' একসঙ্গে ঘটলে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।
এপস্টিনের মৃত্যু শুধু একজন অভিযুক্তের মৃত্যু নয়। এটি ছিল একটি সম্ভাব্য সত্য উন্মোচনের পথ রুদ্ধ হয়ে যাওয়া।
এখন এটি আর গোপন নয় যে এপস্টিন একা ছিলেন না। আদালতের নথি, সাক্ষ্য ও বিভিন্ন তদন্তে উঠে এসেছে তার বিস্তৃত সামাজিক নেটওয়ার্কের কথা, যেখানে রাজনীতিক, কর্পোরেট নেতা, রাজপরিবারের সদস্য এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের নাম এসেছে।
আইনের দৃষ্টিতে নাম উঠে আসা মানেই অপরাধ প্রমাণ নয়, এ কথা অবশ্যই সত্য। কিন্তু প্রকৃত প্রশ্ন অন্য জায়গায়: কেন এই সম্পর্কগুলোর পূর্ণাঙ্গ, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত হলো না? কেন ক্ষমতার বলয়ের কাছাকাছি পৌঁছোলেই তদন্তের গতি শ্লথ হয়ে যায়?
এখানেই তথাকথিত সভ্য বিশ্বের রাজনৈতিক ভণ্ডামি নগ্ন হয়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে যারা মানবাধিকার, নারী ও শিশু সুরক্ষা নিয়ে বজ্রকণ্ঠে ভাষণ দেন, তারাই নিজেদের ব্যবস্থার ভেতরে এই অপরাধকে বছরের পর বছর চলতে দিয়েছেন। নৈতিকতা এখানে একটি কূটনৈতিক শব্দ যা ব্যবহারে আকর্ষণীয়, প্রয়োগে অনুপস্থিত।
সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো ভুক্তভোগীদের কণ্ঠস্বরের পরিণতি। বহু কিশোরী প্রথমে অবিশ্বাসের শিকার হয়েছে, পরে আইনি জটিলতায় ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, এবং শেষ পর্যন্ত অর্থের বিনিময়ে ন্যায়বিচারের দাবি সীমিত করতে বাধ্য হয়েছে। এটিকে ন্যায়বিচার বলা যায় না। এটি প্রাতিষ্ঠানিক আপস, ক্ষমতার সঙ্গে করা এক নীরব সমঝোতা।
সভ্যতার মানদণ্ড যদি হয় দুর্বলদের সুরক্ষা এবং আইনের সামনে সমতা, তবে এপস্টিন কাণ্ড স্পষ্ট করে দেয়, এই বিশ্ব সেই পরীক্ষায় ব্যর্থ। এখানে সমস্যা শুধু একজন অপরাধীর নয়; সমস্যা একটি ব্যবস্থার, যা ক্ষমতাকে রক্ষা করে এবং নির্যাতিতদের নীরবতা চাপিয়ে দেয়।
এই কাণ্ডের শিক্ষা স্পষ্ট, এবং অস্বস্তিকর। যতদিন না ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত সম্ভব হচ্ছে, যতদিন না বিচারব্যবস্থা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত হচ্ছে, ততদিন 'সভ্য বিশ্ব' শব্দবন্ধটি কেবল একটি ফাঁপা দাবি হয়েই থাকবে - একটি সুন্দর মুখোশ, যার আড়ালে লুকিয়ে থাকে পচন।
Comments