অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা থেকে টেকসই প্রবৃদ্ধি: পুঁজিবাজারের জন্য করণীয়
বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশ নামমাত্র প্রবৃদ্ধির কিছু সাফল্য দেখালেও এর অন্তর্নিহিত কাঠামোগত দুর্বলতা শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, আর্থিক খাত এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর গুরুতর চাপ সৃষ্টি করেছে। এই বাস্তবতা উপলব্ধি করাই আজকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ প্রকৃত সংস্কার ছাড়া সাময়িক স্থিতিশীলতা টেকসই প্রবৃদ্ধিতে রূপ নিতে পারে না।
পূর্ববর্তী সরকারের সময় অর্থনীতিতে যে সংকট তৈরি হয়, তার মূলে ছিল দুর্নীতি, দুর্বল আর্থিক শাসন এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার অভাব। ব্যাংকিং খাতে রাজনৈতিক প্রভাব ও অনিয়ম এতটাই গভীর ছিল যে খেলাপি ঋণের হার এক পর্যায়ে প্রায় ৩৬ শতাংশে পৌঁছায়, যা বিশ্বে অন্যতম সর্বোচ্চ। এর অর্থ হলো, ব্যাংকিং ব্যবস্থার একটি বড় অংশ কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল। একই সময়ে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় কিছু গোষ্ঠীর মাধ্যমে অর্থ পাচার ও মূলধন সরে যাওয়ার ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দ্রুত ক্ষয় হয়। ২০২২ সালের শেষে যেখানে রিজার্ভ ছিল ৩৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি, ২০২৪ সালের মাঝামাঝি এসে তা কমে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে।
এই সংকটের মধ্যেও সুদের হার কৃত্রিমভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখার সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ২০২০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ৯ শতাংশ সুদহার সীমা বজায় রাখা হয়, এমন এক সময়ে যখন মূল্যস্ফীতি দ্রুত বাড়ছিল। ফলে সঞ্চয় নিরুৎসাহিত হয়, আমদানি বাড়ে এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তীব্র হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক দুর্বল ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখতে বিপুল অঙ্কের তারল্য সরবরাহ করে—যার বড় অংশ বাস্তব উৎপাদনে না গিয়ে মূল্যস্ফীতি বাড়িয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক ছিল তথ্যের অস্বচ্ছতা; প্রকৃত আর্থিক অবস্থার সঠিক চিত্র প্রকাশ না পাওয়ায় সময়মতো নীতিগত সংশোধন সম্ভব হয়নি।
এই পটভূমিতেই গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। সীমিত সময় ও জটিল রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেও তারা অর্থনীতিতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। বাজারভিত্তিক বিনিময় হার চালুর ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনরুদ্ধারের পথে ফিরেছে। কঠোর আমদানি ব্যবস্থাপনা ও মুদ্রানীতির সংযম মূল্যস্ফীতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এনেছে। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ সংকট মোকাবিলায় সম্পদ মান যাচাই, কঠোর ঋণ শ্রেণিকরণ এবং তথ্য স্বচ্ছতার উদ্যোগ ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে।
তবে বাস্তবতা হলো, এই ম্যাক্রো স্থিতিশীলতা এখনও শক্তিশালী প্রবৃদ্ধিতে রূপ নেয়নি। চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এখনো সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। এর প্রধান কারণ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণ নিয়ে স্পষ্টতার অভাব। বিনিয়োগের জন্য কেবল অর্থনৈতিক সূচক নয়, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নীতির ধারাবাহিকতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এই প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অগ্রগতি কিছুটা আশার সঞ্চার করেছে। দীর্ঘ ১৭ বছর পর তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনে রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। নির্বাচনী রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে যে ধোঁয়াশা ছিল, তা কিছুটা হলেও কাটতে শুরু করেছে। বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ একটি নির্বাচিত ও স্থিতিশীল সরকারের অধীনে নীতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকার সম্ভাবনা বেশি। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হলে আগামী বছর থেকে প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে অর্থনীতির সবচেয়ে দুর্বল জায়গা হিসেবে এখনো রয়ে গেছে দেশের পুঁজিবাজার। ম্যাক্রো অর্থনীতিতে কিছু উন্নতি হলেও শেয়ারবাজার প্রায় পাঁচ বছরের সর্বনিম্ন স্তরে ঘোরাফেরা করছে। দীর্ঘদিন নতুন আইপিও না আসা, তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য পর্যাপ্ত কর প্রণোদনার অভাব, দুর্বল করপোরেট গভর্ন্যান্স এবং উচ্চ সুদের হার বিনিয়োগকারীদের বাজার থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। বাস্তবতা হলো, প্রায় চারশ তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে হাতে গোনা কয়েকটি ছাড়া অধিকাংশই বিনিয়োগযোগ্য নয়। ফলে বাজারে তারল্য সংকট, আস্থার অভাব ও ধারাবাহিক দরপতনের একটি দুষ্টচক্র তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ এখন এমন এক মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া গেলে এই চিত্র বদলানো সম্ভব। এর জন্য পুঁজিবাজার সংস্কারকে অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে। তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য কর সুবিধা বাড়ানো, লভ্যাংশ আয়ের একটি অংশ করমুক্ত করা, আইপিও অনুমোদনের দীর্ঘসূত্রতা কমানো এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা জোরদার করা জরুরি। একই সঙ্গে মিউচুয়াল ফান্ড, বন্ড মার্কেট ও বিমা খাতের অংশগ্রহণ বাড়িয়ে বাজারে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীল মূলধন আনতে হবে।
ম্যাক্রো অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, রাজনৈতিক স্পষ্টতা এবং কাঠামোগত সংস্কার—এই তিনটি যদি সমন্বিতভাবে এগোয়, তবে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও পুঁজিবাজার নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে পারে। বর্তমান সংকটকে যদি আমরা সংস্কারের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে পারি, তবে বাংলাদেশ শুধু স্থিতিশীলতাই নয়, টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে অগ্রসর হতে পারবে।
লেখক: ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ভ্যানগার্ড এসেট ম্যানেজমেন্ট লি:
Comments