আয় আছে, তবু সংসার চলে না: ঋণের জালে বাংলাদেশের পরিবার
আয় বাড়ছে, কিন্তু তার চেয়ে বেশি চাপে পড়ছে সংসারের হিসাব। মাসের শেষ দিকে ধার, কিস্তি আর বকেয়া বিল, অনেক পরিবারের কাছে আর্থিক অনিশ্চয়তা এখন নিত্যদিনের বাস্তবতা।
একসময় মাসের শুরুতে বেতন হাতে পেলে সংসারের খরচের হিসাব করা হতো। বাড়িভাড়া, বাজার, সন্তানের পড়াশোনা, যাতায়াত, চিকিৎসা সবকিছুর জন্য আলাদা করে টাকা রাখার চেষ্টা থাকত। সামান্য সঞ্চয় হলে সেটিকে ভবিষ্যতের নিরাপত্তা বলে মনে হতো। কিন্তু এখন অনেক পরিবারের কাছে হিসাবটি যেন উল্টো হয়ে গেছে। বেতন পাওয়ার আগেই ঠিক করতে হচ্ছে, কোন বিলটি আগে দেওয়া হবে, কোন খরচটি পিছিয়ে দেওয়া যায়, আর কোথা থেকে ধার করলে মাসটা পার করা সম্ভব।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৫ সালের জীবনযাত্রার মানবিষয়ক বিশেষ জরিপের ফলাফল এই চাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র তুলে ধরেছে। ১৮ অক্টোবর ২০২৬-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ৪৭ দশমিক ৪২ শতাংশ পরিবার গত এক বছরে জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে ঋণ নিয়েছে। অর্থাৎ জরিপে অংশ নেওয়া পরিবারগুলোর প্রায় প্রতি দুটির একটিকে দৈনন্দিন ব্যয় সামলাতে ধার করতে হয়েছে।
আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি: সংসারের হিসাব মিলছে না কেন?
বিবিএসের ওই বিশেষ জরিপে দেশের গড় মাসিক পারিবারিক আয় পাওয়া গেছে ৩৩ হাজার ৫১৩ টাকা। বিপরীতে গড় মাসিক ব্যয় ৩৫ হাজার ৩১১ টাকা। অর্থাৎ গড় হিসাবে একটি পরিবারের মাসিক ব্যয় তার আয়ের চেয়ে ১ হাজার ৭৯৮ টাকা বেশি।
বিবিএসের জীবনযাত্রার মান জরিপ ২০২৫ অনুযায়ী, গড় মাসিক আয় ৩৩,৫১৩, গড় মাসিক ব্যয় ৩৫,৩১১ মাসিক গড় ঘাটতি ১,৭৯৮
আয় ও ব্যয়ের জাতীয় গড়ের ব্যবধান; প্রত্যেক পরিবারের প্রকৃত ঘাটতি নয়। এই ব্যবধানকে ছোট মনে হতে পারে। কিন্তু মাসে ১ হাজার ৭৯৮ টাকা ঘাটতি হলে বছরে তা দাঁড়ায় ২১ হাজার ৫৭৬ টাকা। পরিবারের আগে থেকে সঞ্চয় না থাকলে বা হঠাৎ চিকিৎসা বা শিক্ষার খরচ এলে ঘাটতি পূরণের জন্য ধার করার প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।
অবশ্য জাতীয় গড় দিয়ে সব পরিবারের অবস্থা বোঝা যায় না। কারও আয় অনেক বেশি, কারও অনেক কম। কারও নিজস্ব বাড়ি আছে, কারও আয়ের বড় অংশ চলে যায় ভাড়ায়। তবু আয় ও ব্যয়ের গড়ের এই ব্যবধান দেখায়, সংসারের হিসাব মেলানো কেন অনেক পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
ঋণ নেওয়ার চাপে গ্রাম, শহর ও নগরজীবন
ঋণের প্রয়োজন সব অঞ্চলে সমান নয়। বিবিএসের বিশেষ জরিপে দেখা গেছে, গত এক বছরে জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে ঋণ নেওয়া পরিবারের হার গ্রামে ৫১ দশমিক ৯১ শতাংশ, শহরাঞ্চলে ৪০ দশমিক ১৯ শতাংশ এবং সিটি করপোরেশন এলাকায় ৩২ দশমিক ১১ শতাংশ।
গ্রামে নিয়মিত আয় না থাকা, কৃষির মৌসুমি অনিশ্চয়তা, চিকিৎসার ব্যয় বা দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর চাপ ঋণের প্রয়োজন তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে শহরের পরিবারকে বাড়িভাড়া, যাতায়াত, সন্তানের শিক্ষা, ইউটিলিটি বিল ও অন্যান্য নগদ ব্যয়ের সঙ্গে লড়তে হয়। জরিপের পরিসংখ্যান থেকে অবশ্য ঋণ নেওয়ার একক কোনো কারণ নির্ধারণ করা যায় না। তবে অঞ্চলভেদে ঋণগ্রহণের এই পার্থক্য পরিবারগুলোর আর্থিক বাস্তবতা আরও গভীরভাবে অনুসন্ধানের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
বিশেষ করে গ্রামের পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ: ঋণ কি কৃষি, ব্যবসা বা উৎপাদনশীল কাজে বিনিয়োগের জন্য নেওয়া হচ্ছে, নাকি খাবার, চিকিৎসা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে?
দুই ধরনের ঋণের ফল এক নয়। উৎপাদনশীল বিনিয়োগ থেকে আয় তৈরি হতে পারে। কিন্তু নিয়মিত আয় না থাকলে শুধু সংসার চালানোর জন্য নেওয়া ঋণ পরিশোধ করা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
মূল্যস্ফীতি কমলেও স্বস্তি কেন ফিরছে না?
সংসারের ব্যয়ের চাপ বোঝার জন্য মূল্যস্ফীতির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ২২ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ। আগস্টে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ।
মূল্যস্ফীতি বলতে সাধারণভাবে পণ্য ও সেবার দামের সামগ্রিক বৃদ্ধির হার বোঝায়। মূল্যস্ফীতির হার কমে গেলেও সাধারণত তার অর্থ এই নয় যে আগের দামগুলো আবার কমে গেছে। দাম বৃদ্ধির গতি কমতে পারে, কিন্তু বাজারদর আগের উচ্চ অবস্থানেই থেকে যেতে পারে।
ধরা যাক, কোনো পরিবারের মাসিক বাজার খরচ আগে ছিল ১০ হাজার টাকা। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ায় সেই খরচ ১১ হাজার টাকায় উঠল। পরে মূল্যস্ফীতির হার কমলেও বাজারের দাম আগের জায়গায় ফিরে না এলে পরিবারটির বাড়তি ব্যয় থেকেই যাবে।
এখানেই স্থির আয়ের মানুষের সংকট। বেতন বা মজুরি যদি প্রয়োজনীয় ব্যয়ের তুলনায় ধীরে বাড়ে, তাহলে একই আয় দিয়ে আগের মতো পণ্য ও সেবা কেনা সম্ভব হয় না। মাসের শেষে সঞ্চয় কমে, জরুরি খরচের জন্য রাখা টাকা শেষ হয়, তারপর প্রয়োজন দেখা দেয় ঋণের।
ঋণের কিস্তি যখন আয়ের বড় অংশ নিয়ে নেয়
ঋণ নেওয়া নিজেই সব সময় সংকটের লক্ষণ নয়। বাড়ি কেনা, ব্যবসা সম্প্রসারণ, শিক্ষা বা উৎপাদনশীল কাজে ঋণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সমস্যা তৈরি হয় যখন ঋণের অর্থ আয় তৈরির বদলে প্রতিদিনের খরচ মেটাতে ব্যবহৃত হয় এবং সেই ঋণের কিস্তি পরিশোধের জন্য পর্যাপ্ত আয় থাকে না।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা নিয়ে ১২ অক্টোবর ২০২৬-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে গ্রামীণ ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপের একটি উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণা অনুযায়ী, ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে যাঁরা আয়ের ৪০ শতাংশের বেশি ঋণের কিস্তি দিতে ব্যয় করেন, তাঁদের হার ২০১০ সালের ২২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪১ শতাংশ হয়েছে। দরিদ্রতম ২০ শতাংশ পরিবারের ক্ষেত্রে এই হার ৪৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭৯ শতাংশ হয়েছে।
এই পরিসংখ্যানের অর্থ, ঋণগ্রহীতা দরিদ্রতম পরিবারগুলোর একটি বড় অংশের আয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ কিস্তি পরিশোধে চলে যাচ্ছে। ফলে খাবার, চিকিৎসা, শিক্ষা কিংবা অন্য জরুরি খরচের জন্য হাতে টাকা কম থাকতে পারে।
ধরা যাক, একটি পরিবারের মাসিক আয় ২০ হাজার টাকা। এর মধ্যে ঋণের কিস্তি দিতে হয় ৮ হাজার টাকা। তাহলে খাবার, বাড়িভাড়া, শিক্ষা, চিকিৎসা, যাতায়াত ও অন্যান্য খরচের জন্য অবশিষ্ট থাকে ১২ হাজার টাকা। কোনো জরুরি ব্যয় তৈরি হলে পরিবারটি আবার নতুন ঋণের দিকে ঝুঁকতে পারে।
এটি একটি ব্যাখ্যামূলক উদাহরণ, কোনো নির্দিষ্ট পরিবারের বাস্তব ঘটনা নয়। কিন্তু এ ধরনের হিসাব বোঝায়, ঋণ পরিশোধের চাপ কীভাবে একটি পরিবারের আর্থিক স্বাধীনতা সীমিত করে দিতে পারে।
ঋণ থেকে ঋণ: যে চক্র ভাঙা কঠিন
একটি পরিবার যখন নিয়মিত আয়ের তুলনায় বেশি ব্যয় করে, তখন প্রথমে সঞ্চয় ভাঙতে পারে। সঞ্চয় শেষ হলে ধার করতে হয়। পরবর্তী মাসে সেই ধার বা ঋণের কিস্তি পরিশোধের পর হাতে টাকা কম থাকে। তখন আবার নতুন করে ধার করার প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।
এই চক্রের মধ্যে থাকা পরিবারের জন্য শুধু অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানোর পরামর্শ যথেষ্ট নয়। পরিবারের ব্যয়ের বড় অংশ যদি খাবার, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও যাতায়াতের মতো মৌলিক প্রয়োজনেই ব্যয় হয়, তাহলে সেখান থেকে কাটছাঁট করার সুযোগ সীমিত। তাই সমস্যাটিকে শুধু ব্যক্তিগত আর্থিক ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে পুরো বাস্তবতা বোঝা যাবে না। নিয়মিত কর্মসংস্থান, আয় বৃদ্ধির সুযোগ, ন্যায্য মজুরি, ঋণের শর্ত এবং সামাজিক সুরক্ষার বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিতে হবে।
মধ্যবিত্তের সংকট: দারিদ্র্য নয়, নিরাপত্তার অভাব
আর্থিক সংকটের আলোচনা সাধারণত দরিদ্র মানুষের দিকে বেশি মনোযোগ দেয়। কিন্তু আয় থাকলেও সঞ্চয় না থাকা এবং হঠাৎ কোনো ধাক্কা সামলানোর সক্ষমতা হারানো মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্যও বড় ঝুঁকি।
মধ্যবিত্তের একটি অংশের নিয়মিত বেতন আছে, সন্তানের স্কুলে পড়াশোনা চলছে, পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসার প্রয়োজন আছে, বাড়িভাড়া বা আবাসনঋণের কিস্তি রয়েছে। বাইরে থেকে জীবন স্বাভাবিক মনে হলেও মাসিক বাজেটে সামান্য পরিবর্তন ঘটলেই হিসাব এলোমেলো হয়ে যেতে পারে।
বেতন বাড়লেও যদি বাড়িভাড়া, শিক্ষা, চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ একই সঙ্গে বাড়ে, তাহলে বাড়তি আয়ের বড় অংশ ব্যয় হয়ে যেতে পারে। আর সঞ্চয় না থাকলে চাকরি হারানো, অসুস্থতা কিংবা পরিবারের অন্য কোনো জরুরি পরিস্থিতি ঋণের প্রয়োজন তৈরি করতে পারে।
পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) ২০২৫ সালের জাতীয় জরিপে দারিদ্র্য ও আর্থিক ঝুঁকির বিষয়টি উঠে এসেছিল। ১৮ অক্টোবর ২০২৬-এ প্রকাশিত নতুন বিশ্লেষণে প্রতিষ্ঠানটির গবেষকেরা পরিবারের আর্থিক দুর্বলতা, অপর্যাপ্ত সঞ্চয় এবং ক্রমবর্ধমান ঋণের চাপকে বাংলাদেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
অর্থাৎ পরিবারের প্রকৃত নিরাপত্তা শুধু মাসিক আয় দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। জরুরি সময়ে সঞ্চয় ব্যবহার করার সুযোগ, স্থায়ী আয়ের নিশ্চয়তা এবং অপ্রত্যাশিত ব্যয় সামলানোর সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।
সমাধান কোথায়: শুধু সঞ্চয়ের পরামর্শ দিয়ে কি সংকট কাটবে?
ব্যক্তিগত পর্যায়ে আয়-ব্যয়ের হিসাব রাখা, ঋণের সুদ ও কিস্তি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নেওয়া, নতুন ঋণ নেওয়ার আগে পরিশোধের সক্ষমতা যাচাই করা এবং সম্ভব হলে জরুরি তহবিল গড়ে তোলার চেষ্টা উপকারী হতে পারে।
তবে যাদের আয় প্রয়োজনীয় ব্যয়ের চেয়েই কম, তাদের জন্য এসব পরামর্শের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যে পরিবার মাসের শেষে ধার করতে বাধ্য হয়, তাদের কাছে সঞ্চয়ের জন্য টাকা আলাদা রাখা অনেক সময় বাস্তবসম্মত নয়।
একটি পরিবার শুধু আয় করলেই স্বচ্ছল হয় না। আয় থেকে প্রয়োজনীয় ব্যয় মিটিয়ে ভবিষ্যতের জন্য কিছুটা নিরাপত্তা তৈরি করতে পারলেই স্বচ্ছলতার ভিত্তি গড়ে ওঠে। সেই ভিত্তিই যদি দুর্বল হয়ে যায়, তাহলে আয় থাকা সত্ত্বেও ঋণ হয়ে উঠতে পারে পরিবারের নিত্যদিনের সঙ্গী।
Comments