রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের সেপ্টেম্বর মাসের সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিবেদন
গত সেপ্টেম্বর মাসে দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৪৪২টি। নিহত ৪২৩ জন এবং আহত ৬৭৪ জন। নিহতের মধ্যে নারী ৭৩, শিশু ৬১। ১৫৪টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত ১৩৯ জন, যা মোট নিহতের ৩২.৮৬ শতাংশ। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার ৩৪.৮৪ শতাংশ। দুর্ঘটনায় ১০৬ জন পথচারী নিহত হয়েছেন, যা মোট নিহতের ২৫.০৫ শতাংশ। যানবাহনের চালক ও সহকারী নিহত হয়েছেন ৫৩ জন, অর্থাৎ ১২.৫২ শতাংশ।
এই সময়ে ১১টি নৌ-দুর্ঘটনায় ১৬ জন নিহত, ৭ জন আহত এবং ৪ জন নিখোঁজ রয়েছেন। ২৩টি রেল ট্র্যাক দুর্ঘটনায় ১৯ জন নিহত এবং ৬ জন আহত হয়েছেন।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন ৯টি জাতীয় দৈনিক, ১৭টি জাতীয় ও আঞ্চলিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল, বিভিন্ন ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া এবং নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে।
যানবাহনভিত্তিক নিহতের চিত্র:
দুর্ঘটনায় যানবাহনভিত্তিক নিহতের পরিসংখ্যানে দেখা যায়- মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী ১৩৯ জন (৩২.৮৬%), বাসের যাত্রী ২৬ জন (৬.১৪%), ট্রাক-কাভার্ডভ্যান-ট্রলি আরোহী ১৯ জন (৪.৪৯%), মাইক্রোবাস-প্রাইভেটকার-অ্যাম্বুলেন্স-জীপ আরোহী ২১ জন (৪.৯৬%), থ্রি-হুইলার যাত্রী (অটোরিকশা-অটোভ্যান-ইজিবাইক-সিএনজি-লেগুনা) ৮৮ জন (২০.৮০%), স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনের যাত্রী (নসিমন-ভটভটি-মাহিন্দ্র-টমটম) ১৮ জন (৪.২৫%) এবং বাইসাইকেল আরোহী ৬ জন (১.৪১%) নিহত হয়েছেন।
দুর্ঘটনা সংঘটিত সড়কের ধরন:
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ বলছে, দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে ১৪৫টি (৩২.৮০%) জাতীয় মহাসড়কে, ১৭৮টি (৪০.২৭%) আঞ্চলিক সড়কে, ৫৬টি (১২.৬৬%) গ্রামীণ সড়কে এবং ৬৩টি (১৪.২৫%) শহরের সড়কে সংঘটিত হয়েছে।
দুর্ঘটনার ধরন:
দুর্ঘটনাসমূহের ৯৮টি (২২.১৭%) মুখোমুখি সংঘর্ষ, ১৬৮টি (৩৮%) নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে, ১০৯টি (২৪.৬৬%) পথচারীকে চাপা/ধাক্কা দেয়া, ৬১টি (১৩.৮০%) যানবাহনের পেছনে আঘাত করা এবং ৬টি (১.৩৫%) অন্যান্য কারণে ঘটেছে।
দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত যানবাহন:
দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত যানবাহনের মধ্যে- ট্রাক-কাভার্ডভ্যান-পিকআপ-ট্রাক্টর-ট্রলি-লরি-ড্রাম ট্রাক-সিটি করপোরেশনের ময়লাবাহী ট্রাক ২৩.২৯%, যাত্রীবাহী বাস ১৬.৩৫%, মাইক্রোবাস-প্রাইভেটকার-অ্যাম্বুলেন্স-জীপ ১১.৫৭%, মোটরসাইকেল ২৩.৪৪%, থ্রি-হুইলার (অটোরিকশা-অটোভ্যান-ইজিবাইক-সিএনজি-লেগুনা) ১৮.৬৬%, স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহন (নসিমন-ভটভটি-আলমসাধু-টমটম-মাহিন্দ্র) ৪.৬৩%, বাইসাইকেল ১.১৫% এবং অজ্ঞাত যানবাহন ৬.৬৫%।
দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত যানবাহনের সংখ্যা:
দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত যানবাহনের সংখ্যা ৬৯১টি। (বাস ১১৩, ট্রাক ৯৩, কাভার্ডভ্যান ২৯, পিকআপ ১৭, ট্রাক্টর ৪, ট্রলি ৬, লরি ৭, ড্রাম ট্রাক ৩, সিটি করপোরেশনের ময়লাবাহী ট্রাক ২, মাইক্রোবাস ১২, প্রাইভেটকার ১৫, অ্যাম্বুলেন্স ৮, জীপ ৫, মোটরসাইকেল ১৬২, থ্রি-হুইলার ১২৯ (অটোরিকশা-অটোভ্যান-ইজিবাইক-সিএনজি-লেগুনা), স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহন ৩২ (নসিমন-ভটভটি-আলমসাধু-টমটম-মাহিন্দ্র), বাইসাইকেল ৮ এবং অজ্ঞাত যানবাহন ৪৬টি।
দুর্ঘটনার সময় বিশ্লেষণ:
সময় বিশ্লেষণে দেখা যায়, দুর্ঘটনাসমূহ ঘটেছে ভোরে ৮.১৪%, সকালে ২৪.৪৩%, দুপুরে ২১.২৬%, বিকালে ১৭.৪২%, সন্ধ্যায় ১১.৭৬% এবং রাতে ১৬.৯৬%।
দুর্ঘটনার বিভাগওয়ারী পরিসংখ্যান:
দুর্ঘটনার বিভাগওয়ারী পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকা বিভাগে দুর্ঘটনা ২৯.৮৬%, প্রাণহানি ৩১.৬৭%, রাজশাহী বিভাগে দুর্ঘটনা ১২.২১%, প্রাণহানি ১০.৮৭%, চট্টগ্রাম বিভাগে দুর্ঘটনা ১৭.৮৭%, প্রাণহানি ১৭.৭৩%, খুলনা বিভাগে দুর্ঘটনা ১৭.৪২%, প্রাণহানি ১৪.৪২%, বরিশাল বিভাগে দুর্ঘটনা ৫.২০%, প্রাণহানি ৬.৬১%, সিলেট বিভাগে দুর্ঘটনা ৪.৫২%, প্রাণহানি ৪.৯৬%, রংপুর বিভাগে দুর্ঘটনা ৫.৬৫%, প্রাণহানি ৫.৯১% এবং ময়মনসিংহ বিভাগে দুর্ঘটনা ৭.২৩%, প্রাণহানি ৭.৮০% ঘটেছে।
ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি ১৩২টি দুর্ঘটনায় ১৩৪ জন নিহত হয়েছেন। সিলেট বিভাগে সবচেয়ে কম ২০টি দুর্ঘটনায় ২১ জন নিহত হয়েছেন। একক জেলা হিসেবে গাজীপুর জেলায় সবচেয়ে বেশি ৩৮ জন নিহত হয়েছেন। রাজধানী ঢাকায় ৫২টি দুর্ঘটনায় ২১ জন নিহত এবং ৪৭ জন আহত হয়েছেন।
নিহতদের পেশাগত পরিচয়:
গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, পুলিশ সদস্য ২ জন, সেনা সদস্য ১ জন, শিক্ষক ১৩ জন, সাংবাদিক ৩ জন, চিকিৎসক ২ জন, প্রকৌশলী ৪ জন, কাস্টমস কর্মকর্তা ১ জন, বিদেশী নাগরিক (মাইকেল) ১ জন, বিভিন্ন ব্যাংক-বীমা কর্মকর্তা ও কর্মচারী ১১ জন, এনজিও কর্মী ১৮ জন, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ২৪ জন, স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন ব্যবসায়ী ২৫ জন, ঔষধ ও বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী বিক্রয় প্রতিনিধি ২১ জন, মসজিদের ইমাম/খাদেম ৩ জন, মোটর মেকানিক ৪ জন, পোশাক শ্রমিক ৬ জন, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ১ জন, দিন মজুর ১৪ জন এবং বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৫৮ জন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে।
দুর্ঘটনা পর্যালোচনা ও মন্তব্য:
সেপ্টেম্বর মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে নিহত হয়েছে ১৪ জন। অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটছে অতিরিক্ত গতির কারণে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে। এই গতি নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তির মাধ্যমে নজরদারী এবং চালকদের মোটিভেশনাল প্রশিক্ষণ দরকার। যানবাহনের বেপরোয়া গতি এবং পথচারীদের অসচেতনতার কারণে পথচারী নিহতের ঘটনা বাড়ছে। এজন্য সরকারি উদ্যোগে গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে জীবনমুখি সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাতে হবে।
সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণসমূহ:
১. ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন; ২. ত্রুটিপূর্ণ সড়ক; ৩. বেপরোয়া গতি; ৪. চালকদের বেপরোয়া মানসিকতা, অদক্ষতা ও শারীরিক-মানসিক অসুস্থতা; ৫. বেতন-কর্মঘন্টা নির্দিষ্ট না থাকা; ৬. মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল; ৭. তরুণ-যুবদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো; ৮. জনসাধারণের মধ্যে ট্রাফিক আইন না জানা ও না মানার প্রবণতা; ৯. দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা; ১০. বিআরটিএ-র সক্ষমতার ঘাটতি; এবং ১১. গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজি।
সুপারিশসমূহ:
১. জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল (NRSC) পুনর্গঠন করে এই কাউন্সিলের অধীনে BRTA, BRTC এবং DTCA পরিচালনা করতে হবে। কাউন্সিলের হাতে আইন, বিধি ও নীতিমালা প্রণয়নের ক্ষমতা থাকতে হবে।
২. BRTA, BRTC এবং DTCA এর ব্যবস্থাপনা ও কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে এবং এসব টেকনিক্যাল প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়োগ দিতে হবে।
৩. মোটরযানে আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে।
৪. সড়ক থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন প্রত্যাহার করতে হবে।
৫. রাজধানীতে রুট রেশনালাইজেশনের মাধ্যমে কোম্পানীভিত্তিক আধুনিক বাস সার্ভিস চালু করতে হবে।
৬. বিআরটিসির বাসের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং পরিবহন সেবা উন্নত করে সরকারের পরিবহন সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
৭. দক্ষ চালক তৈরির প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ বৃদ্ধি করে তাদের বেতন, কর্মঘন্টা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে।
৮. স্বল্প গতির ছোট যানবাহনের জন্য সকল মহাসড়কে সার্ভিস রোড নির্মাণ-সহ নিরাপদ রোড ডিজাইন করতে হবে।
৯. সকল রেল ক্রসিংয়ে গেইট-কীপার নিয়োগ করতে হবে।
১০. সড়ক ব্যবহারকারীদের সচেতন করতে ও দক্ষতা বাড়াতে জাতীয় বাজেটে অর্থ বরাদ্দ করতে হবে।
১১. প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে। কারণ, তাঁরা জনপ্রশাসন পরিচালনা ও নীতিমালা বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভ'মিকা পালন করেন।
১২. টেকসই পরিবহন কৌশলের অধীনে সড়ক, রেল ও নৌ-পরিবহন একত্রিত করে একটি অভিন্ন যোগাযোগ মন্ত্রণালয় গঠন করতে হবে। এতে করে সমন্বিত, পরিকল্পিত, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।
সময়োপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং সড়ক ব্যবহারকারীদের জন্য শিক্ষা-সচেতনতা কার্যক্রমের মাধ্যমে নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। তবে এক্ষেত্রে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা অতীব জরুরি।
Comments