পরের অপ্রতিমকে বাঁচাতে কী করছি আমরা?
বাংলাদেশ আজ শোকার্ত। আবারও একটি শিশুর নিথর দেহ আমাদের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে এমন এক প্রশ্ন, যার উত্তর আমরা বহুদিন ধরে খুঁজছি-এই দেশে শিশুর নিরাপদ জায়গা আসলে কোথায়?
কুমিল্লার ১৩ বছরের শিশু ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের মৃত্যু সেই প্রশ্নটিকেই আরও নির্মম করে তুলেছে। গত শুক্রবার বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে যাওয়ার কথা বলে মায়ের আইফোন নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল অপ্রতিম। এরপর আর ফিরেনি। পরদিন তার মরদেহ উদ্ধার হয় লালমাই পাহাড়ের একটি নির্জন জঙ্গল থেকে। মাথায় আঘাতের চিহ্ন ছিল।
অপ্রতিমের মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ একই সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিশু নিখোঁজ, ধর্ষণ, নির্যাতন ও হত্যার খবর আসছে। কোথাও শিশুর মরদেহ মিলছে মাটির নিচে, কোথাও নদীতে, কোথাও আবার নির্জন স্থানে। প্রতিটি ঘটনা যেন আমাদের সামাজিক নিরাপত্তাবোধকে একটু একটু করে ভেঙে দিচ্ছে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাবে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন ঘটনায় ১৫৫ শিশু নিহত হয়েছে। এর মধ্যে শারীরিক নির্যাতন, পারিবারিক নির্যাতন, ধর্ষণের পর হত্যা, ধর্ষণচেষ্টার পর হত্যা, গুলি, অপহরণসহ নানা ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছে শিশুরা। একই সময়ে নিখোঁজ ৩৬ শিশুর মরদেহ উদ্ধারের তথ্যও রয়েছে।
সংখ্যাগুলো কেবল পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে একটি পরিবার আছে, একজন মা-বাবা আছেন, একটি অসমাপ্ত শৈশব আছে। একটি শিশুর মৃত্যু মানে শুধু একটি প্রাণের মৃত্যু নয়; একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ, স্বপ্ন ও নিরাপত্তাবোধেরও বড় একটি অংশের মৃত্যু।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো শিশু নিখোঁজের ব্যাপকতা। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বছরের প্রথম সাত মাসে ১৫ হাজারের বেশি শিশুর নিখোঁজ হওয়ার খবর এসেছে। সব নিখোঁজ শিশুর পরিণতি যে একই রকম, তা নয়। কিন্তু এত বিপুলসংখ্যক শিশুর নিখোঁজ হওয়ার খবরই আমাদের শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করে।
প্রশ্ন হচ্ছে, একটি শিশু যখন নিখোঁজ হয়, তখন তাকে খুঁজে বের করার জন্য আমাদের ব্যবস্থা কতটা দ্রুত সক্রিয় হয়? পরিবার থানায় গেলে তারা কতটা সহযোগিতা পায়? শিশুর বক্তব্য নেওয়ার ক্ষেত্রে পুলিশ ও প্রশাসন কতটা শিশুবান্ধব? মামলা হওয়ার পর তদন্ত কতটা কার্যকর হয়? বিচারপ্রক্রিয়া কতটা দ্রুত এগোয়?
শুধু অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করলেই সমস্যার পুরো সমাধান হবে না। কারণ একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার আগেই তাকে সুরক্ষিত রাখার ব্যবস্থা থাকতে হবে। স্কুল, মাদ্রাসা, কর্মক্ষেত্র, খেলার মাঠ, গণপরিবহন-সব জায়গাতেই শিশুর নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
আমাদের আরেকটি বাস্তবতা স্বীকার করতে হবে, শিশুর বিরুদ্ধে অপরাধ অনেক সময় অপরিচিত কেউ করে না। পরিচিত ব্যক্তি, আত্মীয়, প্রতিবেশী কিংবা পরিবারের কাছাকাছি থাকা মানুষের বিরুদ্ধেও অভিযোগ ওঠে। ফলে শুধু শিশুদের 'অপরিচিত মানুষের কাছ থেকে সাবধান' বললেই দায়িত্ব শেষ হয় না। তাদের এমন পরিবেশ দিতে হবে, যেখানে তারা ভয় না পেয়ে কোনো অস্বস্তিকর ঘটনা মা-বাবা, শিক্ষক বা দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে জানাতে পারে।
এখানেই পরিবারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। শিশুকে শুধু নিয়ন্ত্রণ নয়, তার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে যাচ্ছে, এসব জানার পাশাপাশি তাকে এমন আত্মবিশ্বাস দিতে হবে, যাতে বিপদে পড়লে সে সাহায্য চাইতে পারে।
তবে দায়িত্ব কেবল পরিবারের নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব আরও বড়। শিশুবান্ধব পুলিশি ব্যবস্থা, দ্রুত অভিযোগ গ্রহণ, কার্যকর নিখোঁজ শিশু অনুসন্ধান ব্যবস্থা, নিরাপদ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় পর্যায়ে সুরক্ষা কাঠামো এবং প্রয়োজনীয় মানসিক-সামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
আর বিচার? বিচার অবশ্যই হতে হবে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও আইনসম্মতভাবে। কোনো শিশু হত্যার ঘটনায় যদি দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়, তাহলে শুধু একটি মামলার বিচার বিলম্বিত হয় না, সমাজের আস্থাও ক্ষয়ে যায়। তবে বিচার মানে কেবল কঠোর শাস্তির দাবি নয়; তদন্ত, প্রমাণ সংগ্রহ, সাক্ষীর সুরক্ষা এবং আদালতের কার্যক্রম, পুরো প্রক্রিয়াটিকেই কার্যকর করতে হবে।
অপ্রতিমের মৃত্যু আমাদের আরেকবার মনে করিয়ে দিয়েছে, শিশুর নিরাপত্তা কোনো পরিবার একা নিশ্চিত করতে পারে না। একটি শিশু যখন বাড়ি থেকে বের হয়, তখন তার নিরাপত্তার সঙ্গে রাষ্ট্র, সমাজ, প্রতিষ্ঠান এবং আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব জড়িয়ে যায়।
আমরা প্রায়ই কোনো মর্মান্তিক ঘটনার পর ক্ষোভ প্রকাশ করি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদ করি, দ্রুত বিচারের দাবি তুলি। তারপর কিছুদিন পর আরেকটি ঘটনা এসে আগের ঘটনাটিকে আড়াল করে দেয়। এই চক্র ভাঙতে হলে শোককে শুধু আবেগে আটকে রাখলে চলবে না; সেটিকে কার্যকর সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে রূপ দিতে হবে।
একটি শিশুর কাছে পৃথিবীটা নিরাপদ হওয়ার কথা। তার কাছে খেলার মাঠ মানে আনন্দ, বন্ধু মানে বিশ্বাস, স্কুল মানে শেখার জায়গা, আর পরিবার মানে আশ্রয়। সেই পৃথিবীতেই যদি ভয় ঢুকে পড়ে, তাহলে আমরা শুধু একটি শিশুকে নয়, তার শৈশবকেও হত্যা করি।
অপ্রতিম আর ফিরবে না। তার পরিবার যে শূন্যতার মধ্যে পড়েছে, তা কোনো বিচারেই পূরণ হওয়ার নয়। কিন্তু তার মৃত্যু যদি আমাদের শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো নতুন করে দেখতে বাধ্য করে, যদি আরেকটি শিশুকে বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে, তাহলেই অন্তত এই নির্মম মৃত্যুর মধ্য থেকে একটি সামাজিক শিক্ষা বেরিয়ে আসবে।
Comments