বয়সের সঙ্গে বদলায় নারীর পুষ্টির চাহিদা, কোন বয়সে কী খাবেন?
নারীর জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে শরীরে নানা ধরনের পরিবর্তন ঘটে। তাই সব বয়সে একই ধরনের খাবার খেলেই পুষ্টির চাহিদা পূরণ হয় না। বয়ঃসন্ধি থেকে শুরু করে মেনোপজ—বয়স ও শারীরিক পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে খাদ্যতালিকাতেও প্রয়োজন হয় কিছুটা পরিবর্তন।
সংসারের সবার খাবার ও স্বাস্থ্যের দিকে নজর রাখতে গিয়ে অনেক নারী নিজের পুষ্টির বিষয়টি উপেক্ষা করেন। তবে চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদদের মতে, নারীদের নিজেদের স্বাস্থ্য নিয়েও সমানভাবে সচেতন হওয়া জরুরি। বিশেষ করে মেনোপজের পর নয়, বরং জীবনের প্রতিটি ধাপেই প্রয়োজন অনুযায়ী পুষ্টি গ্রহণের দিকে নজর দেওয়া উচিত।
পুষ্টিবিদ রাখি চট্টোপাধ্যায়ের মতে, ভারতীয় খাদ্যাভ্যাসে অনেক সময় পর্যাপ্ত প্রোটিন থাকে না। অথচ নারীর সুস্থতার জন্য প্রোটিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক নারীর প্রতিদিন শরীরের প্রতি কেজি ওজনের জন্য প্রায় ০.৮ গ্রাম প্রোটিন প্রয়োজন হতে পারে। ফলে কারও ওজন ৬০ কেজি হলে দৈনিক প্রায় ৪৮ গ্রাম প্রোটিনের প্রয়োজন হতে পারে।
তবে শুধু প্রোটিনের দিকে নজর দিলেই হবে না। বয়সের বিভিন্ন পর্যায়ে নারীর শরীরে প্রয়োজন হয় আলাদা আলাদা পুষ্টি।
বয়ঃসন্ধিতে কিশোরীদের খাদ্যতালিকায় কী থাকবে?
প্রায় ৯ থেকে ১৮ বছর বয়সকে মেয়েদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে ধরা হয়। এ সময় মস্তিষ্কের বিকাশের পাশাপাশি শরীরে মাসল তৈরি হয় এবং মাসিক শুরু হওয়ার কারণে পুষ্টির চাহিদাতেও পরিবর্তন আসে।
এই সময়ে সঠিক পুষ্টি না পেলে অ্যানিমিয়াসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিতে পারে। পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী, কিশোরীদের খাদ্যতালিকায় আয়রন, ওমেগা-৩ ও ওমেগা-৬ ফ্যাটি অ্যাসিড, ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স, ক্যালসিয়াম এবং পর্যাপ্ত প্রোটিন থাকা প্রয়োজন।
১৯ থেকে ৪৫ বছর বয়সে কী খাবেন?
১৯ থেকে ৪৫ বছর বয়সে নারীদের জীবনযাত্রা, হরমোন ও শারীরিক অবস্থায় বিভিন্ন পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, হাড়ের ঘনত্ব কমে যাওয়া, ঘুমের ঘাটতি এবং অতিরিক্ত মানসিক চাপ স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
এ সময় পুষ্টিবিদের মতে, প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত ক্যালোরি ও প্রোটিন গ্রহণের পাশাপাশি আয়রন, ফলিক অ্যাসিড ও জিঙ্কের মতো পুষ্টি উপাদানের দিকেও নজর দেওয়া জরুরি। বিশেষ করে গর্ভাবস্থায় খাদ্যতালিকা নিয়ে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
মেনোপজের সময় খাদ্যতালিকা কেমন হবে?
৪৫ বছরের পর অনেক নারীর শরীরে মেনোপজ ঘিরে নানা পরিবর্তন শুরু হয়। এ সময় হাড়ের ঘনত্ব কমে যাওয়ার পাশাপাশি ওজন বৃদ্ধি, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, অস্টিওপোরোসিস, হৃদ্রোগ, স্থূলতা ও মেটাবলিক সিন্ড্রোমের মতো সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এই পর্যায়ে খাবারে প্রোটিনের পরিমাণ যথেষ্ট রাখা গুরুত্বপূর্ণ হলেও মোট ক্যালোরি গ্রহণের বিষয়ে সচেতন থাকা দরকার। পাশাপাশি ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স, ভিটামিন ডি, ক্যালসিয়াম এবং ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার খাদ্যতালিকায় রাখা উপকারী হতে পারে।
বয়স অনুযায়ী খাবারে কী পরিবর্তন আনবেন?
নারীর বয়স অনুযায়ী পুষ্টির প্রয়োজন বদলালেও সবার জন্য একই খাদ্যতালিকা প্রযোজ্য নয়। ওজন, উচ্চতা, দৈনন্দিন জীবনযাপন এবং শারীরিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে খাদ্যতালিকা নির্ধারণ করা উচিত।
সাধারণভাবে ঘরে তৈরি সুষম খাবারকে গুরুত্ব দেওয়া যায়। মৌসুমি ফল, বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি, মাছ-মাংস, ডিম, পনির, দুধ ও দইয়ের মতো খাবারের পাশাপাশি ডাল ও বিভিন্ন ধরনের শস্য খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে।
অর্থাৎ, বয়স বাড়ার সঙ্গে শুধু খাবারের পরিমাণ নয়, খাবারে কোন পুষ্টি উপাদান কতটা প্রয়োজন—সেদিকেও নজর দেওয়া জরুরি। ব্যক্তিভেদে প্রয়োজন ভিন্ন হতে পারে, তাই বিশেষ কোনো স্বাস্থ্য সমস্যা বা পুষ্টির ঘাটতি থাকলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্যতালিকা তৈরি করাই সবচেয়ে ভালো।
Comments