ডায়াবিটিস হলে নারী-পুরুষের শরীরে কি একই পরিবর্তন হয়?
ডায়াবিটিস বর্তমানে বহুল পরিচিত একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ। অনিয়মিত জীবনযাপন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং বংশগত কারণসহ নানা বিষয় এই রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে ডায়াবিটিসের প্রভাব সবার শরীরে একইভাবে দেখা যায় না। বিশেষ করে নারী ও পুরুষের শারীরিক গঠন, হরমোন এবং বিপাকীয় বৈশিষ্ট্যের পার্থক্যের কারণে রোগটির জটিলতা ও ঝুঁকিতেও কিছু পার্থক্য থাকতে পারে।
নারী ও পুরুষের ক্ষেত্রে পার্থক্য কোথায়?
ডায়াবিটিসের সঙ্গে হৃদরোগ, কিডনির সমস্যা, উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন জটিলতার সম্পর্ক রয়েছে। তবে নারী ও পুরুষের ক্ষেত্রে এসব ঝুঁকির মাত্রা এক নাও হতে পারে। হরমোনের পরিবর্তন, শরীরে চর্বির বণ্টন, জিনগত বৈশিষ্ট্য এবং হৃদরোগের ঝুঁকির মতো বিষয়গুলো এতে ভূমিকা রাখে।
কিছু ক্ষেত্রে ডায়াবিটিস আক্রান্ত নারীদের হৃদরোগ ও মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যার ঝুঁকি বেশি দেখা যেতে পারে। অন্যদিকে পুরুষদের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু বিপাকীয় ও শারীরিক জটিলতা তুলনামূলক কম বয়সেই দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকতে পারে।
পুরুষদের কোন বিষয়ে বেশি সতর্ক থাকতে হবে?
ডায়াবিটিস আক্রান্ত পুরুষদের হৃদযন্ত্র ও কিডনির স্বাস্থ্যের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, উচ্চ রক্তচাপ, কোলেস্টেরলের অস্বাভাবিক মাত্রা এবং অন্যান্য বিপাকীয় সমস্যা থাকলে জটিলতার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
তাই নিয়মিত রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল পরীক্ষা করা, কিডনির কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ এবং প্রস্রাবের পরীক্ষা করানো গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি ব্যক্তির বয়স ও অন্যান্য ঝুঁকির ওপর ভিত্তি করে হৃদরোগের সম্ভাবনাও চিকিৎসকের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা উচিত।
নারীদের ক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ
ডায়াবিটিসের সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যেরও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। দীর্ঘদিন কোনো দীর্ঘমেয়াদি রোগের সঙ্গে বসবাস করতে গিয়ে উদ্বেগ, মানসিক চাপ কিংবা বিষণ্ণতা তৈরি হতে পারে। আবার মানসিক চাপ বাড়লে নিয়মিত ওষুধ খাওয়া, খাবার নিয়ন্ত্রণ কিংবা শারীরিক পরিশ্রমের মতো ডায়াবিটিস নিয়ন্ত্রণের অভ্যাসগুলোও ব্যাহত হতে পারে।
নারীদের মধ্যে ডায়াবিটিস-সংক্রান্ত মানসিক চাপ ও বিষণ্ণতার প্রবণতা কিছু ক্ষেত্রে বেশি দেখা যেতে পারে। তাই শারীরিক চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের দিকেও নজর দেওয়া জরুরি। প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শে কাউন্সেলিং বা অন্যান্য সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।
হরমোনের পরিবর্তনেও বদলাতে পারে রক্তে শর্করা
নারীদের ক্ষেত্রে জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে হরমোনের পরিবর্তন ডায়াবিটিস নিয়ন্ত্রণে প্রভাব ফেলতে পারে। বয়ঃসন্ধি, মাসিক চক্র, গর্ভাবস্থা এবং মেনোপজের সময় হরমোনের ওঠানামার কারণে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা ও ইনসুলিনের কার্যকারিতায় পরিবর্তন হতে পারে।
পুরুষদের ক্ষেত্রেও বয়স বাড়ার সঙ্গে হরমোনের পরিবর্তন বিপাকীয় স্বাস্থ্য, ওজন এবং হৃদযন্ত্রের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই বয়স ও শারীরিক অবস্থার সঙ্গে মিল রেখে ডায়াবিটিস ব্যবস্থাপনা করা প্রয়োজন।
শুধু সুগার নিয়ন্ত্রণ করলেই হবে না
ডায়াবিটিস নিয়ন্ত্রণের অর্থ কেবল রক্তে শর্করার মাত্রা কমিয়ে রাখা নয়। হৃদযন্ত্র, কিডনি, চোখ ও পায়ের স্বাস্থ্য, রক্তচাপ, কোলেস্টেরল, ওজন এবং মানসিক সুস্থতার দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
ডায়াবিটিস রোগীদের নিয়মিত গ্লুকোজ ও HbA1c পরীক্ষা করার পাশাপাশি চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রক্তচাপ, কোলেস্টেরল, কিডনির কার্যকারিতা এবং প্রস্রাবে অ্যালবুমিন পরীক্ষা করা প্রয়োজন। চোখ ও পায়ের স্বাস্থ্যও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, হঠাৎ দৃষ্টির পরিবর্তন, শরীরের কোনো অংশ অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যাওয়া, অতিরিক্ত দুর্বলতা, পায়ে গুরুতর ক্ষত কিংবা প্রস্রাবের স্বাভাবিক ধরনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সবশেষে মনে রাখা দরকার, ডায়াবিটিসের চিকিৎসা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে। তাই নারী ও পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী জীবনযাপন ও চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
Comments