মক্কা চুক্তি কেন ‘ইসলামি ন্যাটো’ নয়
সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে ৭ আগস্ট ২০২৬ মক্কায় স্বাক্ষরিত নতুন যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে আলোচনা এখন তুঙ্গে। সৌদি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের মধ্যে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির মূল নীতি হলো—তিন দেশের যে কোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। চুক্তিটি ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে। নতুন ত্রিপক্ষীয় কাঠামোর আওতায় যৌথ সামরিক মহড়া, প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা, প্রযুক্তি হস্তান্তর, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও সামরিক প্রশিক্ষণের মতো ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই চুক্তি ঘোষণার পর বাংলাদেশসহ বিভিন্ন মহলে একে 'ইসলামি ন্যাটো' হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এটি কি সত্যিই ইসলামি ন্যাটো?
সামরিক শক্তি আছে, কিন্তু জোটের গভীরতা কতটা? তিন দেশ মিলিয়ে প্রায় ১৪ লাখ সক্রিয় সেনা, ৩ হাজার ৪০০-এর বেশি যুদ্ধবিমান এবং ৩৪০টির বেশি নৌ-সম্পদ রয়েছে। কাগজে-কলমে এটি নিঃসন্দেহে একটি শক্তিশালী সামরিক সমন্বয়। কিন্তু সামরিক সক্ষমতার পরিসংখ্যান আর একটি কার্যকর প্রতিরক্ষা জোটের বাস্তব সক্ষমতা এক বিষয় নয়। ন্যাটোর শক্তি কেবল সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সেনা, বিমান ও নৌবহরের সংখ্যায় নয়। এর প্রকৃত শক্তি গড়ে উঠেছে দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় ও পারস্পরিক নির্ভরতার ওপর। এর অন্তত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি রয়েছে— ১. একটি সমন্বিত ও কার্যকর কমান্ড কাঠামো; ২. কয়েক দশকের যৌথ সামরিক মহড়া, প্রশিক্ষণ ও ইন্টারঅপারেবিলিটি; ৩. লিখিত ও পরীক্ষিত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, বিশেষ করে ন্যাটোর আর্টিকেল ৫। মক্কা চুক্তির ক্ষেত্রে এই তিনটি বিষয় এখনো ন্যাটোর মতো প্রাতিষ্ঠানিক, পরীক্ষিত ও গভীর পর্যায়ে পৌঁছায়নি। অর্থাৎ, তিনটি দেশের সামরিক শক্তি যথেষ্ট হলেও, সেই শক্তিকে একটি একক ও কার্যকর যুদ্ধক্ষমতায় রূপান্তর করার প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো এখনো প্রশ্নের মুখে।
পারমাণবিক 'আমব্রেলা', চুক্তির সবচেয়ে বড় অস্পষ্টতা চুক্তিকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতা। ইসলামাবাদ এখন পর্যন্ত সৌদি আরবকে কোনো আনুষ্ঠানিক 'নিউক্লিয়ার আমব্রেলা' দেওয়ার বিষয়টি প্রকাশ্যে স্বীকার করেনি। একইভাবে চুক্তির প্রকাশ্য বয়ানেও পারমাণবিক প্রতিরোধ বা নিউক্লিয়ার শেয়ারিংয়ের কোনো স্পষ্ট উল্লেখ নেই। এখানেই তৈরি হয় কৌশলগত অস্পষ্টতা। পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো পারমাণবিক নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ঘোষণা করলে আন্তর্জাতিক অপসারণ কাঠামোর আওতায় তাকে তীব্র চাপের মুখে পড়তে হতে পারে। আবার পুরোপুরি অস্বীকার করলেও রিয়াদের কাছে চুক্তিটির অন্যতম সম্ভাব্য কৌশলগত আকর্ষণ দুর্বল হয়ে যেতে পারে। ফলে পারমাণবিক প্রশ্নটি এখনো চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অমীমাংসিত বিষয়গুলোর একটি।
মিশর কেন নেই? আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—মিশর কোথায়? ২০২৬ সালের ১৯ মার্চ রিয়াদ সম্মেলনে মিশর, পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্ককে নিয়ে একটি চতুর্পাক্ষিক নিরাপত্তা কাঠামোর যে রূপরেখা আলোচিত হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত বাস্তব রূপ পায়নি। কায়রোর এই দূরত্বের পেছনে তার বহুমুখী কূটনৈতিক ভারসাম্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ভারতের সঙ্গে মিশরের সম্পর্ক, পাশাপাশি গ্রিস ও সাইপ্রাসকে ঘিরে তুরস্কের সঙ্গে কায়রোর আঞ্চলিক মতপার্থক্য—সব মিলিয়ে মিশরের জন্য তুরস্ক-নেতৃত্বাধীন কোনো নিরাপত্তা কাঠামোয় সরাসরি যুক্ত হওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। ফলে তিন দেশের জোট যতটা রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, তার অনুপস্থিত সদস্যদের তালিকাও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ।
ইয়েমেন যুদ্ধের শিক্ষা এই জোটের বাস্তব যুদ্ধক্ষমতা বোঝার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের ইয়েমেন যুদ্ধ একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তখন সৌদি আরব পাকিস্তানের কাছ থেকে প্রত্যক্ষ সামরিক সহযোগিতা চেয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তানের পার্লামেন্ট জাতীয় স্বার্থ ও আঞ্চলিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিকে বিবেচনায় নিয়ে সরাসরি সামরিক অংশগ্রহণ থেকে সরে আসে। এই ঘটনা একটি মৌলিক বাস্তবতা সামনে আনে। রাজনৈতিকভাবে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি করা এক বিষয়; কিন্তু সেই চুক্তিকে বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে প্রয়োগ করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। একটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা স্বার্থ যখন অন্য সদস্যের সামরিক প্রয়োজনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে যায়, তখন জোটের রাজনৈতিক সংহতি কতটা কার্যকর থাকে—সেটিই আসল পরীক্ষা।
'উম্মাহর নিরাপত্তা' বনাম রাষ্ট্রের বাস্তবতা চুক্তিটিকে কেউ কেউ 'উম্মাহর নিরাপত্তা'র নতুন কাঠামো হিসেবে দেখছেন। কিন্তু কৌশলগত প্রশ্নের বাইরে আরও একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে—এই তিন রাষ্ট্রের নিজেদের রাজনৈতিক, আইনি ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা কতটা অভিন্ন? তিনটি রাষ্ট্রের কোনোটি একই ধরনের শাসনব্যবস্থায় পরিচালিত নয়। সৌদি আরব একটি রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র, যার শাসনব্যবস্থা রাজকীয় ফরমান ও 'বেসিক ল অব গভর্নেন্স'-এর ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত। তুরস্ক একটি সাংবিধানিক প্রজাতন্ত্র এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাকালীন কাঠামো দৃঢ়ভাবে ধর্মনিরপেক্ষ। পাকিস্তানের সংবিধানে ইসলামী বিধান ও পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতি থাকলেও এর প্রশাসনিক ও বিচারিক কাঠামো মূলত আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ওপর প্রতিষ্ঠিত। অতএব, 'ইসলামি জোট' শব্দবন্ধটি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অর্থে ব্যবহার করা গেলেও এটিকে অভিন্ন শরীয়া রাষ্ট্রব্যবস্থার সামরিক জোট হিসেবে দেখা কঠিন।
পশ্চিমা কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্ক আরেকটি বৈপরীত্যও উপেক্ষা করা যায় না। সৌদি আরবের নিরাপত্তা কাঠামো দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গভীর সামরিক ও গোয়েন্দা সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল। তুরস্ক ১৯৫২ সাল থেকে ন্যাটোর সদস্য। আর পাকিস্তানও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে আইএমএফের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে রয়েছে। অর্থাৎ, তিনটি রাষ্ট্রই একদিকে নিজেদের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বাড়াতে চাইছে, অন্যদিকে বৈশ্বিক পশ্চিমা সামরিক, আর্থিক ও প্রযুক্তিগত কাঠামোর সঙ্গেও গভীরভাবে সংযুক্ত। এখানেই 'ইসলামি ন্যাটো' ধারণাটির সঙ্গে বাস্তবতার একটি বড় ফারাক দেখা যায়।
তাহলে কি যুক্তরাষ্ট্রের নেপথ্য পরিকল্পনা? চুক্তিটিকে ঘিরে আরেকটি ধারণা রয়েছে—এটি নাকি যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর ইরান নীতির অংশ। এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সরাসরি সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে ইরানকে পরাস্ত করা কঠিন হওয়ায় ওয়াশিংটন অর্থনৈতিক চাপ ও আঞ্চলিক অংশীদারদের মাধ্যমে তেহরানকে চাপে রাখতে চাইছে। সেই কৌশলে সৌদি আরবকে ইরানের বিরুদ্ধে একটি সম্ভাব্য সামরিক ভারসাম্যকারী হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে। তুরস্কের ক্ষেত্রে ন্যাটো সদস্যপদকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়। আর পাকিস্তানের ক্ষেত্রে দেশটির সামরিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা তাকে সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখতে উৎসাহিত করতে পারে। তবে এই ব্যাখ্যাকে এখনই নিশ্চিত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করলেই ধরে নেওয়া যায় না যে সেটি অন্য কোনো শক্তির নির্দেশে করা হয়েছে। বরং দেখতে হবে, চুক্তির পর তিন দেশ বাস্তবে কী ধরনের সামরিক, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
'ইসলামি ন্যাটো' না, কি বাস্তববাদী নিরাপত্তা জোট? শেষ পর্যন্ত মক্কা চুক্তিকে 'ইসলামি ন্যাটো' বলা হয়তো রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয়, কিন্তু বিশ্লেষণাত্মকভাবে কিছুটা অতিরঞ্জিত। এটি তিনটি মুসলিম-অধ্যুষিত রাষ্ট্রের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা সমঝোতা, এ নিয়ে সন্দেহ নেই। সৌদি আরবের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্ব, পাকিস্তানের সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতা এবং তুরস্কের সামরিক শিল্প ও ন্যাটো-অভিজ্ঞতা, এই তিনটির সমন্বয় চুক্তিটিকে নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। কিন্তু একটি কার্যকর সামরিক জোটের শক্তি শুধু অস্ত্রের সংখ্যা বা সেনাসংখ্যায় নির্ধারিত হয় না। তার জন্য প্রয়োজন অভিন্ন কৌশল, কার্যকর কমান্ড কাঠামো, দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সমন্বয় এবং সংকটের মুহূর্তে পারস্পরিক প্রতিরক্ষার রাজনৈতিক ইচ্ছা। মক্কা চুক্তি সেই পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। কিন্তু এখনই তাকে 'ইসলামি ন্যাটো' বলা হলে বাস্তবতার চেয়ে প্রত্যাশাই বেশি প্রকাশ পাবে। শেষ পর্যন্ত চুক্তিটির প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হবে ঘোষণায় নয়, সংকটের মুহূর্তে তিন দেশ একে অপরের জন্য কতটা বাস্তব সামরিক ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত, তার ওপর।
Comments