ব্যাংকিং খাতে আস্থার সংকট: ঋণের অঙ্কের আড়ালে বড় বিপদ
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত নিয়ে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান কেবল উদ্বেগজনক নয়, বরং অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবার মতো এক কঠিন বার্তা দিচ্ছে। ২০২৬ সালের মার্চ প্রান্তিক শেষে ব্যাংকিং খাতে প্রদর্শিত খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা—মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২.২৬ শতাংশ। মাত্র এক প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা। এই সংখ্যাই যদি পুরো চিত্র হতো, তবুও পরিস্থিতি ভয়াবহ বলেই বিবেচিত হতো। কিন্তু বাস্তবতা আরও গভীর।
অবলোপন করা ঋণ, বিশেষ সুবিধায় পুনঃতফসিল করা ঋণ এবং মামলাধীন প্রকল্পে আটকে থাকা অর্থ হিসাবের মধ্যে আনলে ব্যাংকিং খাতের সমস্যাগ্রস্ত সম্পদের পরিমাণ ১১ লাখ কোটি টাকারও বেশি। মোট ঋণের প্রায় ৬০ শতাংশ যদি কোনো না কোনোভাবে ঝুঁকির মধ্যে থাকে, তাহলে এটিকে আর কেবল 'খেলাপি ঋণের সমস্যা' বলে পাশ কাটানোর সুযোগ নেই। এটি ব্যাংকিং ব্যবস্থার সক্ষমতা, শৃঙ্খলা এবং সর্বোপরি মানুষের আস্থার সংকট।
ব্যাংক মানুষের আমানতের ওপর দাঁড়িয়ে পরিচালিত হয়। একজন সাধারণ আমানতকারী তার সঞ্চয় ব্যাংকে রাখেন এই বিশ্বাসে যে, প্রয়োজনের সময় সেই অর্থ নিরাপদে ফেরত পাবেন। সেই অর্থ যখন দুর্বল যাচাই-বাছাই, রাজনৈতিক প্রভাব, স্বার্থের সংঘাত কিংবা অনিয়মের মাধ্যমে অযোগ্য ঋণগ্রহীতার হাতে চলে যায়, তখন ক্ষতিটা শুধু একটি ব্যাংকের ব্যালান্সশিটে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব পড়ে আমানতকারী, উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর।
দুঃখজনকভাবে, দীর্ঘদিন ধরে আমাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থার একটি বড় অংশ ঋণ দেওয়ার চেয়ে ঋণ উদ্ধারের প্রশাসনিক জটিলতায় বেশি আটকে আছে। আদালতের মামলা, পুনঃতফসিল, অবলোপন এবং নানা বিশেষ সুবিধার মাধ্যমে সমস্যাকে এক হিসাব থেকে অন্য হিসাবে সরানো যেতে পারে; কিন্তু অর্থনৈতিক ক্ষতি এভাবে সরানো যায় না। যে অর্থ উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও নতুন বিনিয়োগে ব্যবহৃত হওয়ার কথা, সেটি বছরের পর বছর আটকে থাকলে অর্থনীতির গতি স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়।
এর সবচেয়ে বড় খেসারত দেন সৎ ও সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তারা। একজন নতুন উদ্যোক্তা যখন ব্যাংকঋণের জন্য দরজায় দরজায় ঘুরে জামানত, কাগজপত্র ও নানা শর্তের বেড়াজালে আটকে যান, অন্যদিকে অদক্ষ বা প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতার বিপুল ঋণ অনাদায়ী থেকেও যদি বারবার পুনঃতফসিলের সুযোগ পায়, তাহলে ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি আস্থা কীভাবে তৈরি হবে? এমন বৈষম্যমূলক কাঠামো উদ্যোক্তা তৈরি করে না; বরং উদ্যোক্তার সম্ভাবনাকে নিরুৎসাহিত করে।
এই পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার প্রথম শর্ত হলো ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা। রাজনৈতিক বা অন্য কোনো প্রভাবের বাইরে থেকে ঋণ অনুমোদন ও ব্যবস্থাপনার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। পরিচালনা পর্ষদে স্বার্থের সংঘাত বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা হতে হবে স্বাধীন, পেশাদার এবং কার্যকর। কোনো ব্যাংক অনিয়ম করলে শুধু জরিমানা বা কাগজে-কলমে নির্দেশনা যথেষ্ট নয়; দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
তবে শুধু খেলাপি ঋণ কমানোর লক্ষ্য নিলেই হবে না। ঋণ পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি ভবিষ্যতে যাতে একই ধরনের ঋণ অনিয়ম তৈরি না হয়, সেই কাঠামোগত সংস্কারও জরুরি। ঋণ দেওয়ার আগে গ্রাহকের প্রকৃত সক্ষমতা যাচাই, অর্থের ব্যবহার পর্যবেক্ষণ, সংশ্লিষ্ট পক্ষকে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোরতা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা জোরদার করতে হবে। ব্যাংকের সাফল্যের মাপকাঠি হওয়া উচিত শুধু কত টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছে তা নয়; কতটা ঋণ উৎপাদনশীল খাতে গেছে এবং কতটা নিরাপদে ফেরত এসেছে, সেটিও।
রাষ্ট্রের দায়িত্বও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জনগণের আমানত কোনো ব্যক্তি, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী কিংবা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী মহলের ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধির উপকরণ হতে পারে না। ব্যাংকিং খাতকে বাঁচাতে হলে অনিয়মের সঙ্গে আপসের সংস্কৃতি ভাঙতে হবে। একই সঙ্গে সৎ ঋণগ্রহীতার জন্য সহজ ও কার্যকর ঋণপ্রাপ্তির পথ তৈরি করতে হবে।
কারণ একটি সুস্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থা শুধু অর্থের পাহারাদার নয়; এটি অর্থনীতির রক্তসঞ্চালন ব্যবস্থা। ব্যাংকের অর্থ যখন উৎপাদন, শিল্প, ব্যবসা ও কর্মসংস্থানে প্রবাহিত হয়, তখন অর্থনীতি এগোয়। আর সেই অর্থ যখন অনিয়মের কারণে আটকে যায়, তখন তার অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র।
তাই ১১ লাখ কোটি টাকার বেশি ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের হিসাবকে নিছক একটি আর্থিক পরিসংখ্যান হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, দুর্বল সুশাসন ও জবাবদিহির ঘাটতির প্রতিচ্ছবি। এখন প্রয়োজন সমস্যাকে লুকিয়ে রাখা নয়, বরং স্বীকার করে কঠিন সংস্কারে যাওয়া। ব্যাংকিং খাতের প্রতি মানুষের আস্থা পুনর্গঠন করা না গেলে শুধু ব্যাংক নয়, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎই ঝুঁকির মুখে পড়বে।
মূলত বানান ও যতিচিহ্ন বা বিসর্গ ব্যবহারের ক্ষেত্রে (যেমন: পুনঃতফসিল) কিছু সংশোধন করা হয়েছে, যা প্রমিত বানানরীতি অনুসরণ করে।
Comments