মেয়রের কলমের খোঁচায় ২২ লাখের ভ্যালুয়েশন ৩ লাখে!
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) একটি হোল্ডিংয়ের মূল্যায়ন কমেছে এক ধাক্কায় প্রায় ১৯ লাখ টাকা। ২২ লাখ টাকার মূল্যায়ন নামিয়ে করা হয়েছে মাত্র ৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা।
অভিযোগ রয়েছে, এই মূল্যায়ন কমানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন তৎকালীন মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী।
শুধু মূল্যায়ন কমানোতেই ঘটনা থেমে থাকেনি। সেই কম মূল্যায়নের ভিত্তিতে বছরের পর বছর করও আদায় করা হয়েছে। এতে ওই একটি হোল্ডিং থেকেই চসিক প্রতিবছর প্রায় ৩ লাখ ১৮ হাজার ৭৫০ টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে বলে নথিপত্র পর্যালোচনায় উঠে এসেছে।
চসিক সূত্রে জানা যায়, মেয়রের হস্তক্ষেপে ভ্যালুয়েশন কমা হোল্ডিংটির নম্বর ১০০৮/১১৫৯ এবং এর করদাতা মো. আবুল হোসেন। এটি চসিকের রাজস্ব সার্কেল-৭ এর আওতাধীন দক্ষিণ আগ্রাবাদ এলাকায়।
নথি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য অনুযায়ী, তৎকালীন মেয়র রেজাউল করিমের নির্দেশেই ২২ লাখ টাকা মূল্যায়ন থেকে কমিয়ে ৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এমনকি মেয়র নিজ হাতেই বিলের কপিতে মূল্যায়ন কমানোর নির্দেশ লিখে স্বাক্ষর করেছিলেন বলেও প্রমাণ পাওয়া গেছে।
হিসাবটা সরল, ২২ লাখ টাকা মূল্যায়নের ওপর ১৭ শতাংশ হারে বার্ষিক কর হওয়ার কথা ৩ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। অথচ ৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা মূল্যায়ন ধরে একই হারে আদায় করা হচ্ছে মাত্র ৫৫ হাজার ২৫০ টাকা। অর্থাৎ বছরে ব্যবধান ৩ লাখ ১৮ হাজার ৭৫০ টাকা।
একটি হোল্ডিং, আর তাতেই বছরে প্রায় ৩ লাখ ১৯ হাজার টাকা রাজস্ব ঘাটতি।
সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, ২০১৮ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত কম মূল্যায়নের ভিত্তিতে কর আদায় হয়ে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রশ্ন থেকেই যায়, ২২ লাখ টাকা থেকে ৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা মূল্যায়ন কমানোর পর সেটি কীভাবে কার্যকর হলো?
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও নথি পর্যালোচনায় জানা যায়, তৎকালীন মেয়রের নির্দেশের পর মূল্যায়ন কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও অনুমোদন পাওয়া যায়নি রিভিউ বোর্ডের। বরং বিষয়টি বাতিল করা হয়েছিল বলে নথিতে উল্লেখ আছে।
এরপরও কার্যকর রাখা হয় ৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা মূল্যায়ন। সেই মূল্যায়নের ভিত্তিতেই চলতে থাকে কর আদায়।
প্রশ্ন থেকেই যায়, মেয়রের নির্দেশে মূল্যায়ন কমানো হলেও রিভিউ বোর্ডের অনুমোদন ছাড়া সেটি কীভাবে কার্যকর হলো?
আর মেয়রের লিখিত নির্দেশের পর নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করার দায়ই বা কার? এ ঘটনায় রাজস্ব সার্কেল-৭ এর তৎকালীন ট্যাক্স কালেক্টর (কর আদায়কারি) ছিলেন আবু মো. মেশকাতুল ইসলাম।
ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে মেশকাতুল ইসলাম বলেন, তৎকালীন মেয়র রেজাউল করিম নিজ হাতে বিলের কপিতে ২২ লাখ টাকা থেকে ৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা মূল্যায়ন করার নির্দেশ দিয়ে স্বাক্ষর করেছিলেন।
তার দাবি, তিনি তখন ট্যাক্স কালেক্টর হিসেবে শুধু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশ পালন করেছেন। তৎকালীন কর কর্মকর্তা মেজবাউদ্দিনের নির্দেশ ও মেয়রের স্বাক্ষরিত কপির ভিত্তিতে তিনি ৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা মূল্যায়নের ওপর ১৭ শতাংশ হারে কর আদায় করেছিলেন।
সেই নির্দেশনা অনুযায়ী পে-অর্ডারের মাধ্যমে কর সংগ্রহ করে তা চসিকের তহবিলে জমা দেন মেশকাতুল ইসলাম। মেশকাতুল আরও বলেন, আপিল বা রিভিউ বোর্ডের মাধ্যমে অ্যাসেসমেন্ট চূড়ান্ত করার বিষয়টি ডিটিও ও টিওর এখতিয়ারভুক্ত। সাধারণ ট্যাক্স কালেক্টরের সেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া বা হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই।
তাঁর ভাষ্য, তৎকালীন টিও সার্কেল থেকে তাঁকে জানানো হয়েছিল, মেয়রের স্বাক্ষরিত কপিটি পরবর্তী সময়ে বোর্ডের মাধ্যমে অনুমোদিত হয়ে যাবে।
এতোকিছুর পরও প্রশ্ন থেকে যায়, কেন ২২ লাখ টাকার মূল্যায়ন ৩ লাখ ২৫ হাজার টাকায় নামানো হলো, মেয়রের এমন নির্দেশের আইনগত ভিত্তি কী ছিল?
বিষয়টি যাচাই করতে চসিক সার্কেল-৭ এর বর্তমান কর কর্মকর্তা এ.কে.এম সালাউদ্দিনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, অনিয়মটি ধরা পড়ার পর থেকে বর্তমানে ওই হোল্ডিংয়ের কর আদায় সম্পূর্ণ স্থগিত রাখা হয়েছে। এবং বকেয়া বিল পরিশোধের জন্য ১০০৮/১১৫৯ হোল্ডিংটির করদাতাকে চিঠিও দেওয়া হয়েছে।
Comments