নতুন ঋণ কমছে, পুরোনো ঋণের বোঝা বাড়ছে
বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের চিত্রে এখন যে বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে, সেটি শুধু অর্থনীতির কোনো একটি সূচকের ওঠানামা নয়; বরং দেশের উন্নয়ন অর্থায়নের কাঠামো যে বদলে যাচ্ছে, তার একটি স্পষ্ট সংকেত। নতুন বৈদেশিক ঋণের প্রতিশ্রুতি কমছে, অর্থছাড় কমছে, অথচ আগের নেওয়া ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধের চাপ দ্রুত বাড়ছে। ফলে প্রশ্ন উঠতেই পারে-বাংলাদেশের প্রতি উন্নয়ন সহযোগীদের আস্থা কি কমে যাচ্ছে? নাকি এটি মূলত বৈশ্বিক অর্থায়নের পরিবর্তিত বাস্তবতার ফল?
উত্তরটি সম্ভবত দুটির মাঝামাঝি। বাংলাদেশের ভাবমূর্তির সংকটকে পুরোপুরি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা, নীতির ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন, প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি, দুর্বল রাজস্ব আহরণ এবং ব্যাংকিং খাতের নানা সমস্যা উন্নয়ন সহযোগীদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে বড় অঙ্কের অর্থায়নের ক্ষেত্রে ঋণদাতারা এখন শুধু প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা দেখেন না; তাঁরা অর্থনৈতিক সংস্কার, সুশাসন, ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং অর্থ ফেরত পাওয়ার সক্ষমতাও বিবেচনা করেন।
তবে সব দায় বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়াও ঠিক হবে না। বিশ্ব অর্থনীতির বাস্তবতাও বদলে গেছে। উন্নত দেশগুলোর নিজেদের ঋণের চাপ, প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি, জনসংখ্যার বার্ধক্য, জলবায়ু পরিবর্তন ও অন্যান্য বৈশ্বিক সংকটের কারণে উন্নয়ন সহায়তার অর্থ কমছে। ফলে স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আগের মতো সহজ শর্তের অর্থ পাওয়া ক্রমেই কঠিন হচ্ছে। বাংলাদেশ যে এই বৈশ্বিক পরিবর্তনের বাইরে থাকবে, এমন প্রত্যাশারও কারণ নেই।
কিন্তু বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা অন্যত্র। পাঁচ বছর আগে যেখানে নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি ছিল ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি, সেখানে তা নেমে এসেছে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারে। বিপরীতে ঋণ পরিশোধের বার্ষিক ব্যয় বেড়ে ৪.৫ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। অর্থাৎ নতুন অর্থের প্রবাহ যখন সংকুচিত হচ্ছে, তখন পুরোনো ঋণের দায় ক্রমেই ভারী হচ্ছে। এটি স্বাভাবিকভাবেই বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি করবে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো সামনে অপেক্ষমাণ দায়। আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার কিস্তি ও সুদ পরিশোধ করতে হবে। এটি কোনো ছোট অঙ্ক নয়। অতীতে ৫৪ বছরে যে পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে, তার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের সমপরিমাণ অর্থ মাত্র পাঁচ বছরে পরিশোধের প্রয়োজন হলে বোঝা যায়, বাংলাদেশের ঋণ ব্যবস্থাপনার সামনে কত বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।
এখানে শুধু ঋণের পরিমাণ নয়, ঋণের গুণগত দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ। সহজ শর্তের ঋণের পরিবর্তে বাজারভিত্তিক ও পরিবর্তনশীল সুদের ঋণের অংশ বাড়লে আন্তর্জাতিক সুদের হার সামান্য বাড়লেও বাংলাদেশের পরিশোধ ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। অর্থাৎ ঋণ এখন আর শুধু উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থের উৎস নয়; এটি ভবিষ্যৎ বাজেট ও বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবস্থাপনারও বড় ঝুঁকি।
অথচ পাইপলাইনে ৪১ বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণ পড়ে আছে। এই অর্থ দ্রুত ছাড় না হলে প্রকল্প বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হবে। আবার অর্থছাড়ের জন্য প্রকল্পের প্রস্তুতি, প্রশাসনিক দক্ষতা ও বাস্তবায়ন সক্ষমতা বাড়ানো না গেলে কাগজে থাকা বড় ঋণের অঙ্ক বাস্তবে খুব বেশি কাজে আসবে না।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, নতুন প্রকল্পে বিদেশি অর্থায়নের অংশও কমছে। এর একটি ইতিবাচক ব্যাখ্যা হতে পারে-বাংলাদেশ নিজের অর্থে প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। কিন্তু যদি এর অর্থ হয় যে উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থ কমে যাওয়ায় সরকারকে ক্রমেই নিজস্ব রাজস্ব থেকে বেশি ব্যয় করতে হচ্ছে, তাহলে সেটি দীর্ঘমেয়াদে চাপ বাড়াবে। কারণ বাংলাদেশের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত এখনো অত্যন্ত কম।
তাই সমস্যার সমাধান আরও বেশি ঋণ নেওয়া নয়। বরং কম ঋণে বেশি অর্থনৈতিক সুফল নিশ্চিত করাই এখন লক্ষ্য হওয়া উচিত। কোন প্রকল্প বৈদেশিক ঋণ পাওয়ার যোগ্য, কোন প্রকল্প থেকে দ্রুত আয় বা উৎপাদনশীলতা বাড়বে এবং কোন ঋণের শর্ত ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর অযথা বোঝা চাপাবে, এসব বিষয়ে কঠোর সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।
বাংলাদেশের ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের সবচেয়ে কার্যকর পথও প্রচারণা নয়, সংস্কার। রাজনৈতিক ও নীতিগত স্থিতিশীলতা, স্বচ্ছ প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, ব্যাংকিং ও রাজস্ব খাতের সংস্কার এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে পারলে উন্নয়ন সহযোগীদের আস্থা ফিরবে। তখন ঋণের পরিমাণ নয়, ঋণের মান ও ব্যবহারের দক্ষতাই বাংলাদেশের শক্তি হয়ে উঠবে।
আজকের সংকেতটি তাই ভয় পাওয়ার জন্য নয়, সতর্ক হওয়ার জন্য। নতুন ঋণ কমে যাওয়া একা বিপদ নয়; বিপদ তখনই, যখন নতুন অর্থ কমে এবং পুরোনো দায় বাড়তে থাকে। বাংলাদেশকে এখন ঋণনির্ভর উন্নয়ন থেকে উৎপাদন, রাজস্ব ও নিজস্ব সম্পদনির্ভর উন্নয়নের দিকে যেতে হবে। কারণ বিদেশি ঋণ উন্নয়নের সিঁড়ি হতে পারে, কিন্তু সেটিকে যদি স্থায়ী ভরসায় পরিণত করা হয়, একসময় সেই সিঁড়িই বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
Comments