বৈদেশিক অর্থায়নে কেন ভাটা?
বাংলাদেশের অর্থনীতির সাম্প্রতিক বৈদেশিক খাতের চিত্রে প্রবাসী আয়ের প্রবৃদ্ধি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক বার্তা। কিন্তু এই একটিমাত্র সূচকের ওপর নির্ভর করে সামগ্রিক পরিস্থিতিকে স্বস্তিদায়ক বলে ধরে নেওয়া হবে বড় ধরনের ভুল। কারণ পরিসংখ্যানের গভীরে তাকালে স্পষ্ট হয়, দেশের বৈদেশিক অর্থায়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি-স্বল্পসুদে উন্নয়ন ঋণ ও উন্নয়ন সহযোগীদের আর্থিক সহায়তা-ধীরে ধীরে সংকুচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ। এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক।
বিদেশি ঋণের প্রতিশ্রুতি এক অর্থবছরে ৩৭ শতাংশ কমে যাওয়া শুধু একটি সংখ্যাগত পরিবর্তন নয়; এটি ভবিষ্যৎ উন্নয়ন বিনিয়োগের সক্ষমতা হ্রাসের ইঙ্গিত। অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, জলবায়ু অভিযোজন, শিক্ষা কিংবা স্বাস্থ্য-এসব খাতে উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার অন্যতম চালিকাশক্তি ছিল। প্রতিশ্রুতি কমে যাওয়ার অর্থ ভবিষ্যতে এসব খাতে বিনিয়োগের সুযোগও সীমিত হয়ে পড়তে পারে। এর পেছনে প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি, প্রশাসনিক জটিলতা কিংবা বাংলাদেশের মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণের ফলে সহজ শর্তে ঋণপ্রাপ্তির সুযোগ কমে যাওয়া-যে কারণই থাকুক না কেন, বাস্তবতা হলো বৈদেশিক অর্থায়নের পরিসর সংকুচিত হচ্ছে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ঋণ গ্রহণের গতি কমলেও ঋণ পরিশোধের চাপ ক্রমাগত বাড়ছে। গত এক দশকে নেওয়া বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর অনেকগুলোই সময়মতো শেষ হয়নি, ব্যয় বেড়েছে কিংবা প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফল এখনো পুরোপুরি আসেনি। ফলে প্রকল্পগুলো থেকে পর্যাপ্ত আয় বা উৎপাদনশীলতা অর্জনের আগেই ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হচ্ছে। আগামী বছরগুলোতে আরও অনেক ঋণের রেয়াতকাল শেষ হলে এই চাপ আরও বাড়বে। রপ্তানি আয় ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন উৎস তৈরি না হলে উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য সরকারের আর্থিক সক্ষমতা সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে প্রবাসী আয়ের প্রবৃদ্ধি অর্থনীতিকে স্বস্তি দিলেও এটিকে স্থায়ী সমাধান হিসেবে দেখা উচিত নয়। বৈশ্বিক শ্রমবাজার, অভিবাসন নীতি কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনে এই প্রবাহ যেকোনো সময় প্রভাবিত হতে পারে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্যের কারণে আমদানি ব্যয় বেড়েই চলেছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও বাণিজ্য ভারসাম্যের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করছে।
এই বাস্তবতায় এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন উন্নয়ন সহযোগীদের আস্থা পুনর্গঠন, প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং প্রতিটি বৈদেশিক ঋণকে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করা। পাশাপাশি রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ, প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং দক্ষ মানবসম্পদ রপ্তানির মাধ্যমে প্রবাসী আয়ের ভিত্তি আরও শক্তিশালী করতে হবে।
বাংলাদেশ এখনো কোনো তাৎক্ষণিক বৈদেশিক সংকটের মুখোমুখি নয়। কিন্তু সতর্কবার্তা স্পষ্ট। আজ যদি বৈদেশিক অর্থায়নের সংকোচন, ঋণ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং রপ্তানি সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা দূর করার কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হয়, তবে আগামী দিনের উন্নয়নের পথ আরও কঠিন হয়ে উঠবে। তাই এখনই আত্মতুষ্টি নয়, বরং দূরদর্শী পরিকল্পনা ও বিচক্ষণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাই হওয়া উচিত সময়ের দাবি।
Comments