সিঙ্গাপুর পারল না, তরুণকে সুস্থ করে তুলল চট্টগ্রামের এভারকেয়ার
বাংলাদেশে ক্যান্সার চিকিৎসার ইতিহাসে এক নতুন মাইলফলক স্থাপন করল চট্টগ্রামের এভারকেয়ার হাসপাতাল। লাইফ সাপোর্ট বা যান্ত্রিক ভেন্টিলেটর সাপোর্টে থাকা অবস্থাতেই জটিল ব্রেইনস্টেম গ্লিওমায় আক্রান্ত এক ১৮ বছর বয়সী রোগীর দেহে সফলভাবে ৩০টি রেডিওথেরাপি সেশন প্রয়োগ করা হয়েছে। আশঙ্কাজনক অবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে রোগী এখন পুরোপুরি সুস্থ এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন। দেশে ভেন্টিলেশনে থাকা কোনো ক্যান্সার রোগীকে রেডিওথেরাপি দিয়ে সুস্থ করে তোলার ঘটনা এটাই প্রথম।
বৃহস্পতিবার (২২ জুলাই) হাসপাতালে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে চাঞ্চল্যকর ও বিস্ময়কর এই সফল চিকিৎসার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে এই জটিল রোগে ভুগছিলেন ওই তরুণ। কিন্তু সম্প্রতি তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে শুরু করে। শরীরের বাম পাশ অবশ হয়ে যাওয়া, কথা বলতে অসুবিধা (ডিসফ্যাসিয়া) এবং খাবার গিলতে না পেরে শ্বাসনালীতে ঢুকে যাওয়ার (অ্যাসপিরেশন) ঝুঁকিতে পড়েন তিনি। উন্নত চিকিৎসার আশায় পরিবার তাকে সিঙ্গাপুরের বিখ্যাত মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতাল এলিজাবেথ হাসপাতালে নিয়ে যায়।
সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হঠাৎ তীব্র হৃদযন্ত্র ও শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা দেখা দিলে তাকে জরুরি ভিত্তিতে যান্ত্রিক ভেন্টিলেশনে (লাইফ সাপোর্ট) নেওয়া হয়। একপর্যায়ে সেখানে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে উঠলে, লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থাতেই স্বজনরা রোগীকে দেশে ফিরিয়ে আনেন।
গুরুতর অবস্থায় চট্টগ্রামে আনার পর তাকে দ্রুত এভারকেয়ার হাসপাতালের মেডিকেল ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (এমআইসিইউ) ভর্তি করা হয়। রোগীর চরম সংকটময় মুহূর্তে দায়িত্ব নেন অনকোলজি বিভাগের ভিজিটিং কনসালটেন্ট ডা. ভাস্কর চক্রবর্তী। পরিবারের পূর্ণ সম্মতিতে তিনি আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থাতেই রেডিওথেরাপি শুরু করার অত্যন্ত সাহসী ও ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন।
নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও মাল্টিডিসিপ্লিনারি টিমের নিখুঁত সমন্বয়ে একে একে ৩০টি রেডিওথেরাপি সেশন সফলভাবে সম্পন্ন করা হয়। ধীরে ধীরে রোগী সাড়া দিতে শুরু করলে তাকে ভেন্টিলেটর থেকে মুক্ত করা হয় এবং গলার ট্র্যাকিওস্টমি টিউব ও খাবার নল (এনজি টিউব) খুলে ফেলা হয়। বিশেষায়িত ফিজিওথেরাপি ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে তিনি ওয়াকারের সাহায্যে হাঁটার শক্তিও ফিরে পান। পরবর্তীতে কনট্রাস্ট এমআরআই ফিউশন স্ক্যানে দেখা যায়, টিউমারটির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে ডা. ভাস্কর চক্রবর্তী বলেন, "লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থায় সম্পূর্ণ আইসিইউ পরিবেশে রেডিওথেরাপি প্রদান করা চিকিৎসাগত দৃষ্টিকোণ থেকে বিশাল চ্যালেঞ্জ ছিল। সফলভাবে রেডিওথেরাপি শেষ করে রোগীকে ভেন্টিলেটর থেকে মুক্ত করা এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা আমাদের পুরো টিমের জন্য এক বিরাট অর্জন।"
হাসপাতালের মেডিকেল সার্ভিসেস ডিরেক্টর ডা. হাসান শাহরিয়ার কবির জানান, এই সাফল্য প্রমাণ করে সঠিক সিদ্ধান্ত, আধুনিক প্রযুক্তি ও সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে বিশ্বমানের ক্যান্সার চিকিৎসা এখন বাংলাদেশেই সম্ভব। অন্যদিকে, চিফ অপারেটিং অফিসার (সিওও) সমীর সিং জোর দিয়ে বলেন যে, চট্টগ্রামেই এখন জটিল ক্যান্সার চিকিৎসার বিশ্বমানের ব্যবস্থা রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে অনকোলজি, ক্রিটিক্যাল কেয়ার, ইন্টারনাল মেডিসিন ও কার্ডিওলজিসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা উপস্থিত ছিলেন।
Comments